এআইয়ের পরামর্শে হাতুড়ি দিয়ে মাকে হত্যা!
পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার, অনলাইন সহিংসতা গবেষণা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ভয়াবহ সংযোগকে সামনে নিয়ে এলো যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের একটি আদালত। উত্তর ওয়েলেসের প্রেস্টাটিনে মা অ্যাঞ্জেলা শেলিসকে (৪৫) হাতুড়ি দিয়ে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে ১৮ বছর বয়সী ট্রিস্টান রবার্ট। আদালত তাকে ন্যূনতম ২২ বছর ৬ মাস কারাগারে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
বিট্রিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রবার্ট হত্যার আগে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেটে হত্যার পদ্ধতি ও অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করে এবং Discord-এ নিজের হতাশা ও প্রতিশোধের ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে নারীবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করত এবং American Psycho চলচ্চিত্রে মুগ্ধ ছিল। হত্যার কয়েকদিন আগে সে ছুরি, হাতুড়ি ও কুঠার কিনে পরিকল্পনা শুরু করে।
একইভাবে দ্য গার্ডিয়ান উল্লেখ করেছে, হত্যার রাতে রবার্ট প্রথমে মাকে বাড়িতে আক্রমণ করে, পরে চিকিৎসার কথা বলে বাইরে নিয়ে যায়। প্রকৃতি সংরক্ষণাগারে একটি বেঞ্চের কাছে নিয়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে স্লেজহ্যামার বের করে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। পুরো প্রক্রিয়া সে একটি ডিক্টাফোনে রেকর্ড করে, যা আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি কারণ তা অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যান্ড্রু থমাস জানান, ‘ডিপসিক পরামর্শ দেয় যে অনভিজ্ঞ খুনির জন্য হাতুড়ি ভালো হতে পারে এবং এর সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। বুধবার আদালত রবার্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়, যার মধ্যে ন্যূনতম ২২ বছর ৬ মাস তাকে কারাগারে থাকতে হবে।
শুনানিতে বলা হয়, রাত প্রায় ১১টার দিকে হামলা শুরু হয়ে ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলে। পরদিন সকালে একদল পথচারী একটি প্রকৃতি সংরক্ষণাগারের কাছে গুরুতর মাথার আঘাতসহ শেলিসকে আবিষ্কার করেন। রেকর্ডকৃত অডিও এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তা আদালতে শোনানো হয়নি। প্রসিকিউটর জানান, সে টানা সাড়ে চার ঘণ্টার রেকর্ড করেছে, যেখানে প্রথম হামলা থেকে শেষ প্রাণঘাতী আঘাত পর্যন্ত সবকিছু রয়েছে।
রেকর্ডে রবার্টকে বলতে শোনা যায়, ‘এটাই সেই মুহূর্ত। আমরা তাকে স্লেজহ্যামার দিয়ে আঘাত করব।’ হত্যার আগের দিনগুলোতে সে ডিসকর্ডে লিখেছিল যে সে নিজেকে পরিত্যক্ত, প্রতারিত ও নিপীড়িত মনে করে এবং প্রতিশোধ ও ন্যায়ের জন্য মাকে হত্যা করছে।
প্রসিকিউশন জানায়, সে ইন্টারনেটে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যাকাণ্ড, হত্যার পদ্ধতি ও অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছে এবং অন্তত তিন সপ্তাহ আগে থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে। ১৮ অক্টোবর সে অনলাইনে কয়েকটি হাতুড়ি, একটি কুঠার ধার করার পাথর, প্লাস্টিক শিট ও গ্লাভস কিনে।
ঘটনার রাতে সে প্রথমে বাড়িতে মায়ের ওপর হামলা চালায়, এরপর চিকিৎসার কথা বলে তাকে বাইরে নিয়ে যায়। মাকে একটি মুখোশ পরিয়ে রেললাইন পার করে একটি প্রকৃতি সংরক্ষণাগারে নিয়ে যায় এবং একটি বেঞ্চের কাছে নিয়ে ব্যাগ থেকে স্লেজহ্যামার বের করে কয়েকবার মাথায় আঘাত করে হত্যা করে।
আদালতে জানানো হয়, শেলিস অস্ত্রটি দেখে চিৎকার শুরু করেছিলেন, এরপর তাকে আঘাত করা হয়। অডিওতে অন্তত চারটি আঘাতের শব্দ শোনা গেছে। হত্যার পর রবার্ট বলে, ‘আমি তাকে মেরে ফেলেছি… কাজ শেষ।’
মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের কারণে শেলিসের মৃত্যু হয়। পরে রবার্ট তার মায়ের মরদেহ প্রায় ১০০ মিটার টেনে নিয়ে গিয়ে ঝোপের মধ্যে ফেলে রেখে আসে। পরে পথচারীরা মরদেহটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে জানায়। উত্তর ওয়েলস পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে এবং চার দিনের জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে।
আদালতে আরও জানানো হয়, শেলিস তার ছেলের মানসিক সমস্যার জন্য সহায়তা খুঁজছিলেন। হত্যার কয়েকদিন আগে তিনি বন্ধুদের জানিয়েছিলেন যে তার ছেলে ছুরি ও হাতুড়ি কিনেছে এবং নিজের ফোনে লিখেছিলেন—“কেন? এগুলো সে কেন কিনেছে? সে কি আমাকে বা নিজেকে আঘাত করতে চায়?”
শুনানির সময় নিহতের বড় ছেলে ইথান রবার্ট কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার মা সবসময় ট্রিস্টানকে ভালোবেসেছেন।’ নিহতের বোন সারা গুন্থার বলেন, ‘তোমার প্রতি আমাদের অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন। রাগ, বিভ্রান্তি ও হৃদয়ভাঙা—সবই আছে, তবে ব্যক্তিগতভাবে এখনো তোমার প্রতি আমার মায়া রয়েছে।’
এই মামলাটি শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এআই প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অনলাইন সহিংসতা গবেষণার ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ডিবিটেক/এনএ/ইকে



