অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ভাইয়ের ইন্টারভিউ শুনলাম। সরকার ঈদের আগে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ব্যস্ত ছিল (৩৭ হাজার দেয়া হচ্ছে এই ফেইজে), কিছু ঈমাম ও মুয়াজ্জিনদের (ইউনিয়ন পর্যায়ে ১/২ জন করে) ভাতা দেয়া হয়েছে। সরকার এখন ফার্মার কার্ড নিয়ে ব্যস্ত আছে, যা ১লা বৈশাখে পাইলট ফেইজ হিসেবে উদ্বোধন করা হবে। সরকার বাজেট নিয়ে ব্যস্ত থাকছে।
সরকার সোশ্যাল সেইফটি বাড়াবে, এরপরে কর ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিবেন। উপদেষ্টা বলেছেন, বাজেটে কর বাড়নো এবং বিনিয়োগ ফ্লোতে সরকার মনোযোগ দিবেন। ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ডের টাকার যোগানে সরকার বিদ্যমান সেইফটি নেটের ডুপ্লিকেশন কমাবে। ডেটাবেজ ঠিক করায় জোর দিবে। খানা প্রতি পভার্টি ডেটাবেজ তৈরি করবেন, মিন পভার্টি টেস্ট (এমপিটি) সাপেক্ষে ডেটাবেজ হবে। এটা বুঝা গেল উপদেষ্টা মহোদয়ের ইন্টারভিউ থেকে।
ফেয়ার এনাফ।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতে সামষ্টিক অর্থনীতির রোগ সারাবে কিনা? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে কিনা এবং বিনিয়োগ আদৌ বাড়াবে কিনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ সূচক বলার সুযোগ নাই। কেননা, যে কোনো ম্যাসিভ স্কেলের অলস ভাতা মূল্যস্ফীতি তৈরি করে এবং রাজস্বের উপর চাপ তৈরি করে, যা আন-সাসটেইনেবল।
দেশে রেমিট্যান্সের উপর ২,৫% প্রণোদনা আছে বহু বছর ধরে। এটা বন্ধ না করে আপনি মূল্যস্ফীতি ৬-৭ এর নিচে আনতে পারবেন না।
আবার দেখুন, ঈদে গারমেন্টসকে আড়াই হাজার কোটি টাকা দেওয়া হল।
কেন?
ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতিতে) কেনায় নয়। জাস্ট রোজা ও ঈদের বেতন দেয়ায়। ৪০ বছরের পুরানো ইন্ডাস্ট্রি কর্মীদের বেতন দিতে পারে না, অর্থাৎ সরকার বেসরকারি কোম্পানির রপ্তানিমূখী শিল্পের ওপেক্সে ইনভেস্ট করছে। ভেরি আন-লাইকলি কেইস। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমরা যদি দেখি প্রডাকশন আছে, ওর্ডার আছে, বিক্রি আছে কিন্তু ওপেক্স চালাতে পারে না, কর্মীর বেতন দিতে পারে না, এটা কোনো না কোনো লুকোচুরি বা জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।
সুদের হার মাফ করতে গিয়ে সরকার মূল ঋণও মাফ করে দিয়েছে, সেখানে ১১৫০ কোটি টাকার বাড়তি চাপ এসেছে। আমরা জানি, এরা সবাই কৃষক নয়।
ফলে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, ভাতা, সুদ-আসল, মাফ, গারমেন্টসের প্রণোদনা এগুলির সামারি হচ্ছে- বিশাল রাজস্ব চাপ, অটেকসই, আন বিয়ারেবল। ফলে সরকারের ঋণ বাড়বে। (আবার রাজস্ব না বাড়লে, বাড়তি ঋণ নেয়া আত্মঘাতী)। রাজস্ব না বাড়লে যে সংখ্যায় দিচ্ছে ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ, এতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, এতে ইনফ্ল্যাশন তেমন বাড়বে না।
আমার ধারণা, রাজস্ব বেশ না বাড়লে ফান্ড জোগান হবে না, তাই কোটি মানুষকে দেওয়া সম্ভব হবে না আদৌ। কারণ আপনি পেনশন, শিক্ষা উপবৃত্তি, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বন্যা ঝড়ের দুর্যোগের ফান্ড, টিসিবি সব বন্ধ করতে পারবেন না। ডুপ্লিকেশন ও মিস অ্যালোকেশন থামানো যাবে যদি রাজনৈতিক চাপ, ঘুষ না থাকে, ডেটাবেজ নিয়ার-একুরেট, ইন্টার-মিনিস্ট্রিয়াল ইন্টার অপারেবল হয়। ব্যক্তি ও পরিবারের আয় বাড়া-কমা, দারিদ্র্য ও দুর্যোগ পরিস্থিতির সাথে ডায়নামিক হয়। নাইলে ভুল যায়গায় ভাতা ভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ পাইল-আপ হবে, নাইলে হাতে প্লাস্টিক কার্ড থাকবে কিন্তু কার্ডে টাকা আসবে না।
এই অর্থবছরে এখনই রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটির কাছাকাছি। উল্লেখ্য, এই বাজেট ইতিহাসে ১ম বারের মত তার আগের বছর থেকে কমেছে। আমরা দেখবো, হয় ধাই ধাই করে লোন বাড়ছে, অথবা বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি একেবারে ছোট হয়ে আসছে।
তবে আমার মত হচ্ছে ইন্টার অপারেবিলিটি, ডায়নামিক পভার্টি ডেটা এবং ইউনিভার্সাল ডেটাবেজ ও ওয়ান-ইউনিক আইডির বিপরীতে ভাতা দেয়া। আলাদা আলাদা কার্ড না দেয়া। তার সাথে বয়স্ক শিক্ষা, পরিবেশ, শৃঙ্খলা ইত্যাদি বৈকালীন সান্ধ্যকালীন শিক্ষা এড করা যা গভর্নেন্সকে শক্তিশালী করে, নাগরিকের সচেতনতা বাড়ায় তা দরকার। ফ্যামিলি কার্ড বা ফারমার কার্ড বা অন্য কোনো ইন্সেন্টিভ দিতে আলাদা প্লাস্টিক কার্ড লাগে না, লাগে বেটার ডেটাবেজ যাতে ভাতা দারিদ্র্য দুর্যোগ এবং আয়হীনতা ও উৎপাদনের সাথে সংযুক্ত থাকে। ইনফ্যাক্ট কৃষককে ইন্সেন্টিভ দিতে ফার্মার কার্ড লাগে না, লাগে কম্প্রিহেন্সিভ ডেটাবেজ। লাগে সারের কীটনাশকের ন্যায্য মূল্য এবং ফলনের যৌক্তিক বাজার দাম যাতে তার 'কস্ট অফ প্রডাকশন' উঠে আসা। যেমন এখন গোলআলুর দাম।
অর্থাৎ 'দেখতে বেনাভোলেন্ট' প্রোগ্রামে অর্থনীতির আসল ক্ষত সারাবে না।
সরকার বিনিয়োগ বাড়াবে, কীভাবে?
মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন, সরকার কী ৫০% বা ৬০% বা তার বেশি খেলাপি ঋণ আছে এমন ব্যাংক মরতে দিবে? ১০টা আছে ৭০% এর উপরে খেলাপি।
না দিলে বিনিয়োগ বাড়বে না। খেলাপি ঋণ বাড়বে। খারাপ ব্যাংক মার্জারে খেলাপি ঋণ বাড়ার গতি কিছু কমতে পারে মাত্র।
রাজনৈতিকভাবে দুর্বৃত্তায়িত ঋণ দেওয়া ব্যাংক বন্ধ না হলে খেলাপি ঋণ যাবে না, পিরিয়ড।
আপনি ক্যাপিটালিজমের সমস্যাকে ক্যাপিটালিজম দিয়েই সল্ভ করবেন।
বড় প্রশ্ন,
সরকার কি ব্যাংক গুলাতে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ঠিক করবে?
দেশের ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা ঠিক করবে? (ডিজিটালি স্বয়ংক্রিয়)
এবং ইন্সুরেন্স ব্যবস্থা ঠিক করবে?
এগুলা বড় বড় পলিটিক্যাল ইকোনোমি সিদ্ধান্ত যা রাজনৈতিক সরকারকে নিতে হবে, এর সাথে বিদ্যমান কায়েমী স্বার্থবাদিতা আছে।
এগুলা ঠিক না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। রাজনৈতিক সরকার আসলে আটো বিনিয়োগ বাড়বে, এটা ডিলিউশান। এন্টাই-ইনভেস্টমেন্টের স্ট্রাকচারাল সমস্যা সমাধান করতে হবে।
ভূল যায়গায় কেনেসীয় অর্থনীতি টেনে আনার প্রবণতা দেখছি।
১। ব্যাংক বন্ধের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
২। গার্মেন্টস প্রনোদনা
৩। সুদের বাইরে মূল ঋণ ওয়েভ করে দেয়া
৪। জ্বালানি অদক্ষ, উৎপাদনে অক্ষম সেকেলে প্রযুক্তির শিল্প-কারখানা খোলা। এগুলা ডেবট বার্ডেন বাড়াবে।
অর্থাৎ দুর্বৃত্তায়ন ও অদক্ষতার বিপরীতে সোশ্যাল বেনিফিট। নট ফেয়ার।
সরকার কি জিডিপি ডেটাবেজ ঠিক করবে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনপিএল ডেটাবেজ ঠিক করায় খেলাপি ঋণ ২ লাখ বেশি দেখাচ্ছে। (টকশো সন্ত্রাসীরা এটা নিয়ে প্রোপাগান্ডা করছে)। যদি না করে, তাইলে একদিকে নতুন বাজেট গলাভরা সংখ্যার হবে, অন্যদিকে বাস্তবায়ন আওয়ামীলীগের মতই এক চতুর্থাংশ কম হবে।
ইন্টারঅপারেবিলিটি এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার না হলে কর জাল বাড়বে না, সোর্স থেকে কর ও ভ্যাট উত্তোলন হবে না। দেশে কর জালের ডিজিটাল ইনফ্রা নাই, শুধু ডিজিটাল সাইলো আছে কিছু।
আন-নেসেসারি এসআরও আছে অনেক, মানি। শুধু এসআরও কমালে কর বাড়বে না। ভুল এসআরও বন্ধে শিল্পে বিনিয়োগ কমতে পারে। দেশ বিনিয়োগ বান্ধব না, ফলে ইন্সেন্টিভ না থাকলে শিল্প বিনিয়োগ কমতে পারে।
অন্যদিকে, বিবিএস সহ যাবতীয় ম্যাক্রো ও মাইক্রো ডেটাবেজ ভালো না হলে, বেটার গভর্নেন্স অসম্ভব। জ্বালানি কত লাগবে, পণ্য উতপাদন ও আমদানি কত লাগবে, কাঁচামাল আমদানি কত (গ্রোথের বিপক্ষে) সব ব্যাহত হবে। আগেও ক্রমাগত হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাত, সিমেন্ট খাত এসব খাত আওয়ামী ভুয়া জিডিপি ডেটার প্রজেকশনে আজকে মাইনকা চিপায়। চিপায় দেশের অর্থনীতি। জিডিপি ডেটাবেজ ঠিক করে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি জ্বালানি রোডম্যাপ নিয়ে বসতে হবে। তবেই মুক্তি।
জিয়া ভাইয়ের লেখা পড়লাম, বলেছেন দেশ ব্যালান্স শিট রেসিশনে (রিচার্ড কো) পড়েছে। কিন্তু আমরা দেখছি ব্যালান্স-শিট রেসিশন মূলত এটা ব্যাংক গুলোতে, যারা পঞ্জি ঋণ দিয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ নিয়ে মেরে দিয়েছে। হাউজহোল্ড বা রিয়েলএস্টেটে ব্যালান্স শিট ক্রাইসিস সেভাবে দেখছি না।
Bangladesh’s private sector is not broadly deleveraging, rather, credit is misallocated (পঞ্ছি ঋণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী লোকেরা নিয়েছে, মেরে দিয়েছে, পাচার করেছে)। The problem is not lack of demand for loans, but lack of trust, bad asse, Private sector overleverag কম, বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট এসেট ভ্যালু সেভাবে কমেনি, বিদ্যুৎ খাত এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়িত খেলাপি ঋণ ছাড়া প্রকৃত ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে মার্কেটে ইঞ্জেক্ট করেছে এরকম প্রমাণ কম। কোম্পানি গুলো আরও বেশি ঋণ করতে চায়, কিন্তু তাদের অভিযোগ সুদের হার বেশি। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, খুব সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা, ফলে মুদ্রানীতি কাজ করছে না এটা বলা যাবে না।
ফলে, আমাদের এখানে ট্রিপল ক্রাইসিস চলছে।
ক। ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস।
খ। কর জিডিপি হার বিশ্বের সবচেয়ে কম বলে চলছে ফিস্ক্যাল ক্রাইসিস/রেভেনিউ ক্রাইসিস, ট্যাক্স নেট ক্রাইসিস, ট্যাক্স কালেকশন ইনফ্রা ক্রাইসিস।
গ। আছে দুর্নীতি ও স্বল্প দক্ষতা জনিত গভর্নেন্স ক্রাইসিস।
আমাদের পথ কণ্টকাকীর্ণ। এটা পাড়ি দিতে হবে।
লেখকঃ প্রযুক্তিবিদ, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী