এমএফএস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় কঠোর বিধিনিষেধ বুথে ভিড়
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে অবৈধ অর্থের লেনদেন ঠেকাতে মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এজেন্ট নম্বর থেকে টাকা পাঠানো ও উত্তোলন বন্ধ থাকায় নগদ অর্থ তুলতে ব্যাংকের এটিএম বুথে ভিড় করছেন গ্রাহকরা।
৯ ফেব্রুয়ারি, সোমবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ছাড়াও গাজীপুরের কোনাবাড়ির বুথগুলোতে রাতে চাপ বেশি দেখা গেছে। এসব বুথে কর্মর্ত নিরাপত্তাকর্মী জানান, বিকেল থেকেই বুথে টাকা তোলার ভিড় হচ্ছে। তবে টাকা তুলতে গ্রাহকদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
পল্টনের একটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের দায়িত্ব পালন করা হাসান বলেন, ‘এখন এজেন্ট নম্বর থেকে অন্য নম্বরে টাকা পাঠানো বন্ধ আছে। ক্যাশ আউটও বন্ধ। ভোটের কারণে এই নিয়ম করা হয়েছে। ভোটের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।’ কোনাবাড়ী থানাধীন ৯ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত তিতাস সোয়েটার লিঃ এর শফিকুল ইসলাম নামে এক লিংকিং অপারেটর বলেন, নির্বাচনের জন্য আগামীকাল থেকে কারখানা চারদিনের বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভোট দিতে বাড়ী যাবো কিন্তু এখনো পর্যন্ত টাকা তুলতে পারছি না। প্রতিমাসে এভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে পল্টনের ইসলামি ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তুলতে লম্বা সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ২০ জনের মতো গ্রাহককে। ৯টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিকের ৩ নম্বর গেটের বিপরীতের ডাচ বাংলা ব্যাংকের বুথের সামনে রীতিমতো জটলা বাধে কার্ড থেকে নগদ টাকা উত্তলনকারী গ্রাহকদের। মধ্য বাড্ডায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথে রাত ১০টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ১৫-২০ জন মানুষ টাকা তোলার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। গুলশানের স্ট্যান্ডর্ড চাটার্ড ব্যাংকের বুথেও ১০-১২ জনের লাইন দেখা যায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে।
সন্ধ্যার পরে বুথে লাইন দিয়ে টাকা উত্তলন করতে যাওয়া বেশিরভাগ গ্রাহকই ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী। তবে তেজাগাঁ, মতিঝিল ও মিরপুরের বুথগুলোতে দেখা গেছে শ্রমিক শ্রেণীর গ্রাহকদের ভিড়। বেশির ভাগই ছিলেন পোশাক শ্রমিক। বাড্ডার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপরই নির্ভর করি। হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছি। এটিএমে ভিড় থাকায় সময়মতো টাকা পাচ্ছি না।’
মিরপুরের একটি সোয়েটার কারখানায় কর্মরত মামুন মিয়া জানান, টাকা তুলতে এসে প্রায় ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, আজই বেতন হয়েছে। বিকাশও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এখন টাকা তুলতে দাঁড়িয়ে আছি।
চাকরিজীবি হাসান মাহমুদ বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট থেকে টাকা তুলতে না পারায় এখানে আসতে হয়েছে। জরুরি কিছু টাকা দরকার। রকেট এজেন্টের কাছে গিয়ে টাকা তুলতে পারিনি। দুজন এজেন্ট জানিয়েছেন এখন এজেন্ট নম্বর থেকে টাকা পাঠানো এবং ক্যাশ আউট বন্ধ। তবে ব্যক্তিগত নম্বর থেকে ব্যক্তিগত নম্বরে এক হাজার টাকা পাঠানো যাচ্ছে। আমার এর বেশি দরকার। এজন্য বুথে আসলাম।’
রামপুরার একটি বুথে অপেক্ষমান গার্মেন্টসকর্মী সালমা আক্তার বলেন, ‘ঘরের বাজারের টাকার জন্য এসেছি। আগে পাশের এজেন্ট থেকেই টাকা তুলতাম, এখন সেটাও বন্ধ। ছোট বাচ্চা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টকর। ব্যাংক থেকে টাকা তোলা যাচ্ছে, কিন্তু এজেন্টের কাছ থেকে ক্যাশ আউট করা যাচ্ছে না। এটা কেমন নিয়ম হলো? এখন এভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে হচ্ছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মতে, ৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোট ৯৬ ঘণ্টা এমএফএস ও পিপিআই (প্রিপেইড ইনস্ট্রুমেন্ট) লেনদেনের বিশেষ সীমা কার্যকর থাকবে। ওই সময়ে নগদ বা রকেটের মতো সেবা ব্যবহার করে একবারে এক হাজার টাকার বেশি পাঠানো যাবে না। এর ফলে বিকাশ, রকেট, নগদসহ সব এমএফএস প্ল্যাটফর্মে একবারে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পাঠানো যাবে এবং দিনে মোট লেনদেনের সীমা থাকবে ১০টি (১০ হাজার টাকা)। তবে মার্চেন্ট পেমেন্ট ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী লেনদেন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এসময় এমএফএসের মাধ্যমে অন্য সব ধরনের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
স্বাভাবিক সময়ে এমএফএস গ্রাহকেরা এজেন্টের মাধ্যমে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারেন। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো এবং মাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা লেনদেন করা যায়। এছাড়া দিনে সর্বোচ্চ ৫০ এবং মাসে সর্বোচ্চ ১০০টি লেনদেন করা যায়।
এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে এমএফএস-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রতিটি এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ ‘কুইক রেসপন্স সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে সব ধরনের লেনদেনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি (ক্লোজ মনিটরিং) চালানো হবে। সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ডিবিটেক/এএইচ/এমআই



