ইশতেহারে প্রযুক্তিতে কোথায় কোথায় প্রাধান্য দিলো বিএনপি-জামায়াত?
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৬) উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং টেলিকম খাতকে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। উভয় দলই প্রযুক্তিকে শুধু একটি খাত হিসেবে নয়, বরং সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারের ৫৪ পৃষ্ঠার (ইংরেজি সংস্করণ ৫১ পয়েন্ট) ইশতেহারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি ‘ইনভেস্টমেন্ট ও টেক-ড্রিভেন’ অর্থনীতির কথা বলেছে। এর আগের দিন ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানে ৪১ দফার (২৬টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র) ইশতেহারে ‘প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ’ গড়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপি’র ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী
- আইসিটি হাব ও ম্যানুফ্যাকচারিং: বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আইসিটি এবং হার্ডওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে রূপান্তর করা হবে। আগামী ১৮ মাসে প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা।
- ফ্রি ইন্টারনেট (টেলিকম): শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, রেলওয়ে স্টেশন এবং বিমানবন্দরসহ জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে উচ্চগতির ওয়াই-ফাই সেবা প্রদান করা হবে।
- আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে: ডিজিটাল অর্থনীতিতে গতি আনতে এবং ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধার্থে PayPal সহ বিশ্বমানের পেমেন্ট গেটওয়ে বাংলাদেশে চালু করা হবে।
- কানেক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান: দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় কানেক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): বাংলাদেশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
- ই-জুডিশিয়ারি ও স্মার্ট প্রশাসন: বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা হবে যাতে ঘরে বসেই মামলার তথ্য ও সরকারি সেবা পাওয়া যায়।
জমায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে:
· স্মার্ট সোসাইটি ও AI ট্রেনিং: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গড়তে আগামী ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ৫০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার এবং ৫ লাখ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি।
· ডিজিটাল পাহারাদার অ্যাপ: ইশতেহারে অ্যাপ-ভিত্তিক জনসেবা ও স্মার্ট সমাজ তৈরির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরাধ দমন ও অভিযোগ জানাতে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামক একটি অ্যাপ চালু করা ও সেখানে পরিচয় গোপন রেখে চাঁদাবাজি বা ঘুষের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার সুযোগ।
· আমার টাকা আমার হিসাব অ্যাপ: সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এই অ্যাপের মাধ্যমে জনগণ সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সরাসরি দেখতে পারবে। দুর্নীতি কমাতে সরকারি সব কেনাকাটা ও টেন্ডার শতভাগ ডিজিটাল করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
· ডিজিটাল দক্ষতা: পর্যায়ক্রমে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল এবং স্মার্ট ক্লাসরুমে রূপান্তর ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের অধীনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডেটা সায়েন্স এবং রোবোটিক্সের মতো বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা।
· টেক ল্যাব ও ইনকিউবেশন সেন্টার: প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং সারাদেশে ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা হবে যাতে তরুণরা বৈশ্বিক বাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত হতে পারে।
· কৃষি বিপ্লবে প্রযুক্তি: ড্রোন প্রযুক্তি, উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্মার্ট সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিকায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
|
উদ্যোগ |
বিএনপি |
জামায়াত |
|
পরিবার |
প্রতিটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এতে পরিবারের নারীর নাম প্রধান হিসেবে থাকবে। |
সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’র মাধ্যমে রেশন ও সহায়তা প্রদান করা হবে। |
|
কৃষি |
কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি, সার ও বীজের জন্য চালু করা হবে ‘ফার্মার কার্ড’। |
কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা। |
|
তারুণ্য |
যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ সহায়তা। |
শিক্ষিত বেকারদের জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা (সর্বোচ্চ ২ বছর) ভাতা বা সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা। |
|
স্বাস্থ্য |
প্রতিটি নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ প্রোফাইল কার্ড। |
কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের মাধ্যমে অ্যাপ-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা। |
|
শিক্ষা |
Edu-ID ও ফ্রি পাবলিক ওয়াই-ফাই। |
টেক ল্যাব ও AI প্রশিক্ষণ। |
|
সুশাসন |
ই-জুডিশিয়ারি ও পেপাল (PayPal) চালু। |
অ্যাপ-ভিত্তিক জনসেবা ও স্মার্ট সমাজ। |
উভয় দলই গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিতে ডিজিটাল ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দুর্নীতি দূর করা এবং উৎপাদন বাড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। বিএনপির ইশতেহারে ফ্রিল্যান্সিং, পেমেন্ট গেটওয়ে (PayPal) এবং টেলিকম অবকাঠামো (ফ্রি ওয়াই-ফাই) গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে AI ট্রেনিং, দুর্নীতি দমনে বিশেষ অ্যাপ এবং বেকারদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রাধান্য পেয়েছে।
ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম



