উচ্চ বেতনের ভারতীয় সিটিও, সিআইও ও প্রকিউরমেন্ট অফিসার রেখে দেশীয় কর্মী ছাঁটাইয়ের রহস্য কি?
এবার গ্রামীণফোনকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় হুমকী মনে করছেন সাবেক কর্মীরা
এক যুগে ৩৩৬০ কর্মীকে বরখাস্ত, কর্মীদের প্রাপ্য ৫ শতাংশ মুনাফার অংশ পরিশোধে টালবাহানা, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, গ্রাহকের তথ্য পাচার, বিনিয়োগের বহুগুণ অর্থ পাচার, নেটওয়ার্ক বিপর্যয়, ইন্টারনেট সেবায় কারচুপি, গ্রাহকের মামলা, হাসিনার পতনের পর শেয়ার দর ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি, বাজার প্রতিযোগিতা বিনষ্ট ইত্যাদি অভিযোগের সঙ্গে এবার নতুন করে যুক্ত হলো গ্রামীণফোনে কর্মরত তিন ভারতীয় নাগরিকের নাম। একজন বাংলাদেশীকে প্রধন নির্বাহী নিয়োগ করে চমক দেখালেও তাকে নিয়ে রয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ। ভারতের ইউনিনরে ২০১২-১৫ সাল পর্যন্ত চাকরি শেষে বাংলাদেশে গ্রামীণফোনের প্রধান হিসেবে যোগ দেয়ার পর তিনি তার পারিবারিক রাজনৈতিক শক্তির অপব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে এখন জাতীয় নিরপত্তার ঝুঁকিতে ফেলছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। কেননা, তার সময় থেকেই শুরু হয় ভারতীয় সিটিও-দের আধিপত্য। চার বছরের মতো দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালে চলে যেতে হয় মিশরিয় সিটিও মেহদাত এল হুসেইনিকে।
এরই মধ্যে জুলাই অভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে ভারতীয় নাগরিক চিফ টেকনোলজি অফিসার জয় প্রকাশ, চিফ ইনফরমেশন অফিসার ড. নিরঞ্জন শ্রীনিবাসন এবং চিফ প্রোকিউরমেন্ট অফিসার ভাতস কাউস্তভ বহাল থাকাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছেন খোদ গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীরা।
এদের মধ্যে ২৬ বছরের কর্মজীবনে ৫৬ বছর বয়সী জয় প্রকাশ টেলিনর মিয়ানমার থেকে ২০২২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের দায়িত্বে আসেন। এর পরের বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রামীণফোনে সিআইও হিসেবে যোগ দেন তামিলনাডুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার টেকনোলজিতে স্নাতক ড. নিরঞ্জন শ্রীনিবাসন। এই দু’জনের আগে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে চিফ প্রোকিউরমেন্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন ব্যাঙ্গালুরের পুনেতে অবিস্থত সিম্বিওসিস আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকত্তর সম্পন্নকরা ভাতস কাউস্তভ।
ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ও ল’ফুল ইন্টারসেপশনের দায়িত্বে থাকা সিটিও পেগাসাস ঢোকানোর পথ তৈরি করতে পারেন। গ্রাহকের ডেটা, সাইবার আর্কিটেকচার ও ডেটাবেস নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাপ্ত সিআইও গ্রাহকের কল, লোকেশন, ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে (ভারতে) পাচার করতে পারেন। একইভাবে কোন ভেন্ডর থেকে নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম কেনা হবে তার নিয়ন্ত্রণকারী সিপিও প্রোকিউরমেন্টের মাধ্যমে ভেন্ডরের ব্যাকডোর ঢুকতে পারেন বলে শঙ্কা করছেন খোদ গ্রামীণফোনের সাবেক হেড অব অপারেশন আনোয়ার এম হোসাইন। এদেরকে স্পর্শকাতর তিন পদে রাখার শঙ্কাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে অ্যামাজন ডট কমে কর্মরত এই অপারেশন লিড শঙ্কা জানালেন, বাংলাদেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটরটির শীর্ষ পদে কর্মরত ভারতীয় সিএক্সও, ইসরায়েলি সাইবার আর্মস সংস্থা (এনএসও) গ্রুপ দ্বারা নির্মিত একটি স্পাইওয়্যার পেগাসাস’র ব্যবহার এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাধীনতা নিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এদেরকে হুমকী বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেছেন, সম্প্রতি দেখা গেছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, নেতা, এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ফোনালাপ জনসমক্ষে চলে আসছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। ল’ফুল ইন্টারসেপ্ট সিস্টেম অপব্যবহার করে কল রেকর্ডিং করা সম্ভব। পেগাসাস ঢুকিয়ে ফোন থেকেই প্রতিটি আলাপ টেনে নেওয়া যায়। আর যদি টেলিকম কোম্পানির ভেতরে বিদেশি প্রভাব থাকে, তবে সেটা আরও সহজ হয়ে যায়। তাই এটা শুধু বিরোধী বা সাংবাদিকদের জন্য হুমকি নয়। এর আওতায় মন্ত্রী, সচিব, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা সহ দেশের প্রতিটি মানুষ। কোনো গোপন বৈঠক, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, এমনকি কূটনৈতিক আলাপও বিদেশি (ভারতীয়) শত্রু সার্ভারে পৌঁছে যেতে পারে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।
তিনি জানান, গ্রামীণফোনকে পেগাসস-এর সাথে যুক্ত করার একটি প্রজেক্টে সরাসরি কাজ করার কথা ফাঁস করেছেন একজন হুইসেলব্লোয়ার। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই প্রজেক্টে একজন প্রভাবশালী জেনারেলকে (জেনারেল জিয়া) জিপি হাউসে নিয়মিত দেখা গেছে। জিপি.র সিইও ইয়াসির আজমান ও অন্যান্য সিএক্সওরা এতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে— ‘টেলিনর (নরওয়ের মালিক কোম্পানি) কি এ বিষয়ে জানতো? নাকি তারা চোখ বন্ধ করে রেখেছিল?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
আনোয়ার এম হোসাইন আরো জানান, গ্রামীণফোনে কর্মরত সাবেক ভারতীয় সিটিওর বিরুদ্ধে ২০০৪-০৬ সালের মধ্যে ভারতীয় গোয়োন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠলে তৎকালীন সরকার তাকে এক বস্ত্রে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। গ্রামীণফোনের এই সিটিও ছিলেন ইয়োগেস মল্লিক। আনোয়ার হোসাইনের এই দাবি ও অভিযোগের বিষয়ে গ্রামীণফোন ছেড়ে আসা অনেক কর্মীই সহমত পোষণ করেছেন। তবে বর্তমান কর্মীরা প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বিষয়টিকে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে গেছেন অনেকে।
বিজ্ঞাপনে সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে পুঁজি করে ভাইরাল হওয়া অপারেটরটি থেকে বাবা দিবসে ছাঁটাই হওয়া দিনাজপুরের কাস্টমার সার্ভিস সেন্টারের (জিপিসি) দায়িত্বে থাকা কামরুল হাসান বললেন, করোনার সময় ২৪৭ শতাংশ গ্রোথ থাকার পরও এক মেইলে আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যাদের চাকরি সম্মানের সঙ্গে তাদের প্রাপ্য ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও তা গ্রাহ্য করছে না গ্রামীণফোন। তিনি বলেন, ইয়াসির আজমান ভারতের ইউনিনর থেকে বাংলাদেশে গ্রামীণফোনে দায়িত্ব নেয়ার পর এখানে ভারতীয় সিটিও নিয়োগ শুরু হয়। তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী কর্মীদের একেকটা অংশ ছাঁটাই করে ভারতীয় ঠিকাদারদের কাজ দেয়া হয়। তাদের মাধ্যমে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক ও কাস্টমার সার্ভিসকে পঙ্গু করে দেয়া হয়। তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারতীয় উইপ্রো’র প্রযুক্তি ব্যবহার করে। একইসঙ্গে জেনেক্স-কে কলসেন্টারের দায়িত্ব দিয়ে জিপিসিগুলো বন্ধ করে দেয়। এরমাধ্যমে তৃতীয়পক্ষের কাস্টমার সেন্টারে অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দিয়ে গ্রাহকের ডাটা পাচার করে। ঠিকাদারদের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের গ্রাহকদের ডেটা পাচার করার খবরও পরে ফাঁস হয়। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্যতার মাধ্যমে এটা করা হয়েছে। এর পুরো দায় বর্তমান সিইও ইয়াসির আজমানের। এ কাজে তার দোসর ভারতীয় সিএক্সওরা।
বাংলাদেশের সঙ্গে নরওয়ের সরাসরি কোনো বিনিয়োগ চুক্তি না থাকলেও টেলিনরের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশের গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করেছে সিঙ্গাপুর টেলিনর এশিয়া। ১৯৯২ সালে সম্পাদিত ৬ বছরের চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানির সব দায়িত্ব স্থানীয় কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা ভঙ্গ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলেই সিএক্সও পদে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়োগের পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে ১৯৯৭ সাল থেকে যাত্রা শুরু করা গ্রামীণফোন বিগত ১৭ বছরে বর্তমান সিইও’র রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগে নিয়ম বহির্ভূত অনেক সুবিধা নিয়েছেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিওআইপি’র সুযোগ গ্রহণ, কম দামে অন্যায্য চুক্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ফাইবার যোগাযোগ বাগিয়ে নিয়ে তা চড়া মূল্যে বাইরে ভাড়া দেয়া, পুলিশ প্রশাসন কর্তৃক গ্রামীণফোনের কোনো যানবাহন রিক্যুইজেশন করতে না পারা, কর্মী ছাঁটাই করে ৫ শতাংশ মুনাফা চাইতে গিয়ে সাবেক কর্মীদের হামলা-মামলা করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের এসআরও থাকার পরও লাভজনক অবস্থানে থাকা এই কোম্পানিটি কোভিডের সময় রাতের অন্ধকারে ২১৮ কর্মীকে ‘ইউ আর নো মোর’ মেইল দেয়া হয়।
ভারতীয় নাগরিকদের উচ্চ বেতনে স্বপদে বহাল রেখেও স্বৈরাচারি কায়দায় ২০১৯-২০ সালে বেস্ট ইমপ্লয়ি ও পারফরমার পাওয়া কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়। গ্রামীণ ফোনে বর্ষ সেরা কর্মী ফজলুল করিম পিঞ্জ, জামায়েতে ইসলামী বাংলাদেশের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহীদের দ্বিতীয় ছেলে আলী আহমেদ তাহকীকসহ অনেকেই এমন ছাঁটাইয়ের শিকার হন। তাহকীককে চাকরিচ্যুত না করতে চাওয়ায় তৎকালীন কর্পোরে অ্যাফেয়ার্স অফিসার (স্টেক হোল্ডার রিলেশন) ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরীকেও অব্যাহতি দেয়া হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভালো কাজের স্বীকৃতি পেয়ে একই পদ্ধতিতে চাকরি হারান জিপিডিসি স্পেশালিস্ট রামেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। এক দশকের ব্যবধানে স্থায়ী কর্মী দুই হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ২৭৭ জনে নামিয়ে আনা হয়। এভাবেই দেশের কর্মীদের সঙ্গে ‘অন্যায্য’ আচরণ করে আইনি জটিলতা তৈরি করছে। আবার এসব আইনি জটিলতার জন্য আওয়ামী সরকারের আমালে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে আইনি উপদেষ্টা রাখা এবং ড. কামাল হোসেনের ফার্মকে নিযুক্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে কাজ করেন ব্যারিস্টার তানজিমুল ইসলামও। সময়ে পরিবর্তনে এই কাজ এখন বর্তেছে ব্যারিস্টার মাহবুবুদ্দীন খোকন, কায়সার কামাল ও মোস্তাফিজার রহমানের ওপর। এর ফলে একের পর মামলার বিচারের জন্য দেড় দশকের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের। তবে সময়ের সঙ্গে বর্তমানে ক্ষমতাধর আইনজীবিদের নিয়োগে এখনো শঙ্কা কাটেনি তাদের। তবে অতিসম্প্রতি প্রতিযোগিতা কমিশনে আবেদন করে তা খারিজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আশা দেখাচ্ছে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের।
এ বিষয়ে সাবেক কর্মী আদিবা জেরিন বলেন, গত ১৫ বছরে গ্রামীণফোন ধারাবাহিকভাবে শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘন করে আসছে। শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা চাইলে তাদের জবাব আসে দমন-পীড়ন, গ্রেফতার ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার মাধ্যমে। এর আগে ২৯ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, আর বর্তমানে নতুন করে ১৯ জন শ্রমিকের নামে হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছি। এই অন্যায় বন্ধ করতে হবে এখনই। এই দেশে গ্রামীণফোন আজ হালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো আচরণ করছে—শোষণ, জুলুম, আর প্রতিবাদ করলেই দমন-পীড়ন।
গ্রামীণফোন ঐক্য পরিষদে আহ্বায়ক আবু সাদাত মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, হাজার হাজার সাবেক কর্মী আজও তাদের ন্যায্য ৫% পাওনা ও অবৈধ চাকরিচ্যুতির বিচার চাইতে আদালতে ঘুরছে। কিন্তু মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে আছে। কর্মীরা পরিবার নিয়ে পথে বসেছে, অথচ গ্রামীণফোন আইনজীবীর চাপে প্রতিটি মামলাকে স্থবির করে রেখেছে। শুধু কর্মীরা নয়—রাষ্ট্রীয় সংস্থা যেমন বিটিআরসি, এনবিআর ও প্রতিযোগিতা কমিশন-এর সঙ্গেও গ্রামীণফোনের কোটি কোটি টাকার মামলা ঝুলে আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যত অসহায়। আদালতকে প্রভাবিত করে গ্রামীণফোন সরকারকেও দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি করে রেখেছে।
গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীরা বলছেন, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চাকরিরত গ্রামীণফোনের সকল স্থায়ী কর্মীর ন্যায্য অধিকার ৫% বিলম্ব বকেয়া। সরকারি এসআরও দ্বারা এ পাওনা নিশ্চিত থাকলেও গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ তা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেছিল ২০১১ সালে। অবশেষে ২০২৩ সালের ৬ মার্চ তারিখে তারা রিট প্রত্যাহার করে সরকারি প্রজ্ঞাপন মেনে নেয়।কারণ এই রিটের রায় হওয়ার কথা ছিল ৯ মার্চ ২০২৩। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ৬ মার্চ ২০২৩ তারিখে এই রিটটি প্রত্যাহার করে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে আইনগতভাবে এই পাওনা নিশ্চিত হয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ এই ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করে নানা টালবাহানা ও প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করে আসছে। এর প্রতিবাদে সাবেক কর্মীরা গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ-এর ব্যানারে ২ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে গ্রামীণফোন হেড অফিস (জিপি হাউস) এর সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও একাধিকবার পুলিশি হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নিন্দনীয় ঘটনা ঘটে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে। সেদিন গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ হঠাৎ অবস্থানরত সাবেক কর্মীদের উপর নৃশংস লাঠিচার্জ চালায় এবং জল কামান ব্যবহার করে। এতে বহু কর্মী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। একই দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন থেকে ৩ জন নারীসহ মোট ১১ জন কর্মীকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে ২৯ জন সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরে আন্দোলনরত কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলনের সত্য প্রকাশ ও দাবির প্রচার শুরু করলে, আবারও গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এবং নতুনভাবে ১৯ জন কর্মীর নামে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করে। এছাড়া বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, আমাদের মিটিংস্থলে পুলিশ হানা দিয়ে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার এবং নির্যাতন করার পরিকল্পনাও চলছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গ্রামীণফোন তার কর্পোরেট প্রভাব ব্যবহার করে ন্যায্য দাবি দমনে ফ্যাসিবাদী কৌশল অবলম্বন করছে।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের জনসংযোগ শাখায় সুনির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন পাঠালেও সেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যধারীতি গৎবাঁধা উত্তর দিয়েছে। গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন ছিলো দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সিইও ভারতের ইউনিনর থেকে বাংলাদেশে গ্রামীণফোনের শীর্ষ পদে যোগ দিয়ে ভারতীয় সিএক্সওদের রেখে ঠিকাদারের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ও গ্রাহক সেবার কাজ করিয়ে এই খাতে কর্মরত দেশের দুই শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করে দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের বক্তব্য কি? বিগত সরকারের সময় থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আইনজীবিদের মাধ্যমে রাজস্ব থেকে শুরু করে কর্মীদের পাওনা পরিশোধে গড়িমসি করা হচ্ছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কি? কোভিডের সময় রাতের অন্ধকারে ২১৮ কর্মীকে ‘ইউ আর নো মোর’ মেইল দেয়া কতটা মানবিক?
এই প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোনের হেড অফ কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেছেন “গ্রামীণফোন দেশের সকল আইন-কানুন ও বিধি-বিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে। এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেশের ১ নম্বর নেটওয়ার্ক হিসাবে, গত ২৮ বছর ধরে গ্রামীণফোন দেশে মানসম্পন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করে আসছে, যার প্রতি আস্থা রেখেছে প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ গ্রাহক। যার ফলে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটি লাইফলাইন হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে গ্রামীণফোন। বিপুল পরিমাণ ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট থেকে শুরু করে, নেটওয়ার্কের ধারাবাহিক উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযুক্তির বিস্তার ও এর পাশাপাশি দক্ষ ব্যাবসা পরিচালনার মাধ্যমে এ দেশের সরকারি কোষাগারে কর হিসাবে বিপুল অর্থ জমা দেয়া ও শেয়ার হোল্ডারদের জন্য নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানের মাধ্যমে এ দেশের অন্যতম সফল বিনিয়োগের নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে গ্রামীণফোন। উল্লেখ্য যে, গ্রামীণফোন দেশের অন্যতম বৃহৎ করদাতা প্রতিষ্ঠান, যেটি যাত্রা শুরুর পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১,৩০,৫৭৭ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত গ্রামীণফোনের মূলধনী বিনিয়োগের অংক ৫৪,৪০০ কোটি টাকা।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। প্রান্তিক মানুষদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পারিবেশ রক্ষায় গ্রীন এনার্জির ব্যাবহারকে সামনে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে গ্রামীণফোন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণফোন বৈশ্বিক মানদণ্ড ও সুশাসনের নিয়ম মেনে কয়েক ধাপের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে।"







