নতুন টেলিকম নীতিমালায় ‘প্রযুক্তি নিরপেক্ষ’ মডেল
ডজন লাইসেন্সের পাহাড় ভেঙ্গে চার ধাপে সহজ লাইসেন্সিং কাঠামো গড়তে নতুন টেলিকম নীতিমালায় প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক চর্চায় থাকা মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটরকে (এমভিএনও) স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স শর্ত নিশ্চিত করতে ও ভোক্তাদের সেবার মান ও অভিজ্ঞতা উন্নত করতে নীতিমালার লাইসেন্সিং কাঠামোতে ‘প্রযুক্তি নিরপেক্ষ’ মডেল গ্রহণ করা হয়েছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং স্বাধীনতার প্রশ্নেই নতুন নীতিমালা বলে জানিয়েছে সরকার পক্ষ।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রায়োগিক দিক থেকে মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী, সাবমেরিন কেবল অপারেটর, টাওয়ার কোম্পানি ও স্যাটেলাইট সেবা প্রদানকারীকে একটি অটুট বন্ধনে নিয়ে আসবে নতুন এই নীতিমালাটি। এ কারণে অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক (মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ব্রডব্যান্ড অপারেটর), জাতীয় অবকাঠামো (টেলিকম টাওয়ার ও ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক), আন্তর্জাতিক সংযোগ (সাবমেরিন ক্যাবল) ও নন-টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্ক এর জন্য নতুন করে লাইসেন্স গ্রহণের পাশাপাশি লাইসেন্স ছাড়াই কেবল নিবন্ধনের মাধ্যমে ‘টেলিকম এনাবল সার্ভিস’ দিতে পারবেন সেবাদাতারা।
নতুন নীতিমালা প্রসঙ্গে বিশেষ সহাকারী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, “বর্তমান লাইসেন্সিং পদ্ধতিতে মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবস্থা রহিত করে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে যারা ব্যবসা করেন তাদেরকে সেবার মানের নিশ্চিয়তা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তৃতীয়ত এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা সম্প্রসারণ করে ভয়েস কল ও ডেটা সার্ভিসের মূল্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা হয়েছে।”
আর পুরো বিষয়টিকে আরো বোধগম্য ও সহজ করতে এরই মধ্যে বাতিল হওয়া আইএলডিটিএস পলিসি’র স্থলে স্বতন্ত্র নীতিমালা প্রণয়ন করছে নীতি বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেছেন, গত সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালার অধীনে নতুন নির্দেশিকা প্রস্তুত শুরু করেছে বিটিআরসি। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ ইন্টারনেটভিত্তিক ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল (ভিওআইপি) কল নিয়ন্ত্রণে আনতে আইএলডিটিএস নীতিমালা করা হয়েছিলো। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
আইননে কেন এমন আমূল পরিবর্তন করার দরকার হলো প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেছেন, এছাড়াও সুষম সম্পদ বন্টন এবং ফেয়ার মার্কেট কম্পিটশনের মাধ্যমে বৈষম্যহীন একটা বাজার তৈরিতে স্বাধীন কমিশন হিসেবে বিটিআরসি’র জন্ম হয়। কিন্তু ২০১০ সালে এই কাজ করতে সরকারের পূর্বানুমোদন নেয়ার বিধান রাখা হয়। যার ফলশ্রুতিতে আইনের একটি ধারা অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনের সময় সরকার টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করতে পেরেছিলো। তাই ওই আইনের কারণে সরকার এ জন্য বিটিআরসি-কে কোনো আদেশ দিলে তা বেআইনি বলা যায় না। কোনো কম্পানির লাইসেন্স নিতেও সরকারের অনুমোদন নিতে হয়। এই যেমন ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬টি লাইসেন্স যথেষ্ট হলেও ২৮টি পর্যন্ত লাইসেন্স দেয়া হয়। এতে করে কোনো লাইসেন্সেরই যখন বিজনে কেইস হারায় তখন স্বাভাবিক ভাবে নানা রকম অনৈতিক পন্থা ও জটিলতা তৈরি হয়। ভিওআইপি’র জুজু বুড়ির ভয় এর একটি। অপরদিকে সিলেক্টেড কিছু কিছু কোম্পানিকে সব লেয়ারের লাইসেন্স দেয়া হয়। এর ফলে মনোলস্টিক ব্যবস্থায় অনাচার সৃষ্টি হয়। এ জন্য আমরা ২০০১ সালের মূল আইনে ফিরে যেতে চাই। সংসদের আইন ও সরকারে দেয়া নীতিমালার আগে বিটিআরসি ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু ২০০১ সালের আইনের সময়ের চেয়ে এখন প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তখন সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ভয়েস কল সেবা দেয়া হতো। ইন্টারনেট আসার পর ভয়েস ওভার ইন্টারনেটে (ভিওআইপি) অবৈধ ভাবে ভয়েস চুরি ঠেকাতে নীতিমালা করা হয়। এখন সব কিছুই ইন্টারনেট নির্ভর। সব রেভিনিউ আসছে ডেটা থেকে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি ডেটা ফ্রেন্ডলি না। এতো লেয়ার ডেটার প্রবৃদ্ধির জন্য স্যুইটেবল না। তাই ২০০১ এর ফ্রেম ওয়ার্কে থেকে ডেটা ফ্রেন্ডলি হিসেবে নতুন আইন করা হয়েছে। মোবাইল অপারেটরে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ বিদেশি মালিকানা রেখে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ স্থানীয় মালিকানা এবং অবকাঠামোতে ৬৫ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এভাবেই নতুন আইনে টেলিসেবার কভারেজ ও সেবার মানদণ্ডে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল অপারেটরদের ১৮ মাসের মধ্যে অর্ধেক টাওয়ার ফাইবার-অপটিক কেবলে এবং তিন বছরের মধ্যে ৮০ শতাংশ টাওয়ারকে সংযুক্ত করা; জাতীয় ফাইবার ব্যাকবোনকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত টেলিকম-গ্রেড মান বজায় রেখে ভূগর্ভস্থভাবে নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অন্তত এক-চতুর্থাংশ টাওয়ারে ব্যাকআপ পাওয়ার হিসেবে ডিজেল জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা।
নীতিমালা অনুযায়ী, পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণের জন্য বিটিআরসি একটি ‘ন্যাশনাল কোয়ালিটি অব সার্ভিস ড্যাশবোর্ড’ চালু করবে। এই ড্যাশ বোর্ড থেকে অ্যাক্সেসিবিলিটি, কভারেজ, থ্রুপুট ও নির্ভরযোগ্যতার উপর নিকট-রিয়েল-টাইম ডেটা দেখাবে। একইসঙ্গে সিগনিফিক্যান্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি) চিহ্নিত করে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এর মধ্যে ট্যারিফ নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো ভাগাভাগি বাধ্যতামূলক করা, ক্রস-সাবসিডি নিষিদ্ধ করা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা জোরদার করাসহ নানা পদক্ষেপ থাকতে পারে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘যে কোনো লাইসেন্সধারী—এককভাবে বা যৌথভাবে—যদি বাজার ভারসাম্য বিনষ্টে সক্ষম হয়, কার্যকর প্রতিযোগিতা সীমিত করে বা আধিপত্যের অপব্যবহার করে তবে তার বিরুদ্ধে এসএমপি নিয়ন্ত্রণ প্রযোজ্য হবে।’
এছাড়া, নীতিমালা অনুযায়ী অপারেটরদের নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার, ই-বর্জ্য দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে রাষ্ট্রের নজরদারিতেও সীমা আরোপ করা হয়েছে—বলা হয়েছে, বৈধ অনুমোদন এবং বিচারিক বা আধা-বিচারিক নির্দেশ ছাড়া আইনগত হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
নীতিমালকে স্বাগত জানিয়ে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, “আমরা সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানাই এবং সংশোধিত টেলিকম নীতিতে প্রতিফলিত ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো যেমন সক্রিয় নেটওয়ার্ক ও স্পেকট্রাম শেয়ারিংয়ের বিধানকে স্বীকৃতি দিই। তবে, নির্ধারিত মালিকানা শর্তাবলি বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে—এ বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। তারপরও আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে ডিজিটাল বিভাজন কমানো যায় এবং আরও পরামর্শের মাধ্যমে ভবিষ্যত-প্রস্তুত বাংলাদেশের জন্য আমরা আরও অর্জন করতে পারি।”
আর গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “নতুন লাইসেন্সিং নীতি লাইসেন্স একীভূত করার দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা বিচ্ছিন্ন লাইসেন্স কাঠামো থেকে সরে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, এটি টেলিকম শিল্পের জন্য উপকারী হবে। একইসঙ্গে আমরা সরকারকে আহ্বান জানাই বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা দ্রুত চূড়ান্ত ও প্রকাশ করতে, কারণ কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”







