নোয়াখালীতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাচারি ঘর’

নোয়াখালী: কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়কার গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল কাচারি ঘর। বাড়ির সামনের দিকে ঢুকতে আঙিনায় থাকতো কাচারিঘর। আর সেখানে অতিথি, মুসাফির, পথচারী ও শিক্ষার্থীদের থাকা ও পড়াশোনার পাশাপাশি সালিস-বৈঠক, গল্প-আড্ডার জন্য ব্যবহৃত হতো এ ঘর। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে হারিয়ে যেতে বসেছে নোয়াখালীর সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর। যার বিলুপ্তি […] The post নোয়াখালীতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাচারি ঘর’ first appeared on Sarabangla | Breaking N

নোয়াখালীতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাচারি ঘর’
১০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০০  

নোয়াখালী: কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়কার গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল কাচারি ঘর।

বাড়ির সামনের দিকে ঢুকতে আঙিনায় থাকতো কাচারিঘর। আর সেখানে অতিথি, মুসাফির, পথচারী ও শিক্ষার্থীদের থাকা ও পড়াশোনার পাশাপাশি সালিস-বৈঠক, গল্প-আড্ডার জন্য ব্যবহৃত হতো এ ঘর। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে হারিয়ে যেতে বসেছে নোয়াখালীর সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর। যার বিলুপ্তি এখন শেষ প্রান্তে।

দুই হাজার সালের আগেও গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে দেখা যেত কাচারি ঘর। কালের বিবর্তনে এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না গ্রামবাংলার একসময়ের এই আভিজাত্যের প্রতীক কাচারি ঘর।

কাচারি ঘর।

৯টি উপজেলা,৮ টি পৌরসভা ও ৯৩টি ইউনিয়ন নিয়ে নোয়াখালী জেলা গঠিত। জেলার প্রতিটি উপজেলার প্রায় গ্রামেই অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়িতে কাচারি ঘর ছিল। বাড়ির বাইরের আঙিনায় অতিথি, মুসাফির, ছাত্র ও জায়গিরদের থাকার জন্য নির্মিত এ ঘরকে কেউ বলতেন কাচারি ঘর, কেউ বাংলা ঘর। সাধারণত বাড়ির সামনের অংশে, প্রবেশপথের ঘাটলার কাছে কাচারি ঘর নির্মাণ করা হতো। বাড়ির সৌন্দর্যও অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত এ ঘর। অতিথি, পথচারী, মুসাফির ও সাক্ষাৎপ্রার্থীদের থাকার পাশাপাশি বাড়ির ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার ঘর হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতো।

একসময় গ্রামবাংলার অবস্থা সম্পন্ন লোকের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল কাচারি ঘর। চারচালা টিন বা শনের ছাউনি দিয়ে বাড়ির সামনে তৈরি করা হতো এ ঘর। সেখানে নিয়মিত থাকতেন আবাসিক গৃহশিক্ষক বা লজিং মাস্টার। সকালবেলায় এটি মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। স্থানীয় অনেকের মতে, এর ফলে রাতের বেলায় বাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঘটনাও তুলনামূলক কম ঘটত।

জানা যায়, ঈসা খাঁর আমলে কর্মচারীরা বাড়ির দরজার পাশে থাকা কাচারি ঘরে বসে খাজনা আদায় করতেন। জমিদারি প্রথা চালু থাকার সময়ও গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির কাচারিতে বসে খাজনা আদায়ের প্রচলন ছিল। পাশাপাশি সালিস-বৈঠকসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো একাচারি ঘরে।

কাচারি ঘর।

কালের বিবর্তনে সেই কাচারি ঘর এখন বিলুপ্তির পথে। কোনো কোনো বাড়িতে এখনো পুরোনো কাচারি ঘর দেখা গেলেও সেগুলো পড়ে আছে অযত্ন ও অবহেলায়। নেই সেই চিরচেনা শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার আওয়াজ, রাতের জারিগান, লুডু খেলা কিংবা অতিথিদের গল্প-আড্ডা। সকালবেলায় আর শোনা যায় না কুরআন পড়ার মধুর সুর। দিনের বেলায় কাজের শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর করার বিশ্রামস্থল হিসেবেও এখন আর কাচারি ঘরের ব্যবহার নেই। কোথাও কোথাও একসময়কার বাড়ির সৌন্দর্যের প্রতীক এই ঘর অযত্ন-অবহেলায় পরিণত হয়েছে গোয়ালঘরে।

৪ নম্বর কাদির হানিফ ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও বাসিন্দা হাফিজ উল্যা বলেন, আমার বাড়ির বাইরে অবস্থিত কাচারি ঘরটি আগে প্রতিবছর মেরামত করতাম। সেখানে এক সময় লজিং মাষ্টার থাকতো। আবার সেখানে শালিশ বৈঠক ও অতিথিদের বিশ্রামগার হিসেবে ব্যবহার হত। এখন কালের বিবর্তনে আর সে ঘর ব্যবহার হয় না। কাচারি ঘরটি ব্যবহার না করায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। কালের পরিক্রমায় স্মৃতি হিসেবে কাচারি ঘরটি আছে।

নোয়াখালী জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক আমির হোসেন বলেন, এক সময়কার গ্রামবাংলার ঐতিহ্য কাচারি ঘর প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবুও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের গ্রামে এখনো একটি কাচারি ঘর রয়েছে। কিন্তু কাচারি ঘর থাকলেও এখন কোনো কার্যক্রম নেই। ঘরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সদর উপজেলার কাদির ইউনিয়নের কৃষ্ণরামপুরের ফার্মেসী ব্যবসায়ী মিঠু বলেন, ইট-পাথরের আধুনিক ভবনের ভিড়ে গ্রামবাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কোথাও ভগ্নদশায়, কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব ঘর এখন কেবলই অতীতের স্মৃতি বহন করছে। হয়তো আর কিছুদিন পর সেগুলোও হারিয়ে যাবে।থেকে যাবে শুধু গল্প, স্মৃতি আর লোকজ ঐতিহ্যের পাতায়।

The post নোয়াখালীতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাচারি ঘর’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.