কৃষি-প্রযুক্তিতে খাদ্যনীতি তৈরির উদ্যোগ
আতপ চালের চাহিদা বুঝতে ডেটাভিত্তিক গবেষণা
- আতপ চালের ভোগ ও চাহিদা নিয়ে নতুন গবেষণা শুরু হয়েছে
- অঞ্চলভিত্তিক তথ্য ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতি প্রণয়নে কাজে লাগবে
- পুষ্টিমান, ভোক্তা পছন্দ ও চাহিদা বিশ্লেষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় চালের ভোগ, আঞ্চলিক পছন্দ ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপণে ডেটাভিত্তিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কৃষি-প্রযুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন অঞ্চলে কী ধরনের চালের চাহিদা বেশি, ভোক্তার পছন্দ কী এবং পুষ্টিমান কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে—এসব তথ্য ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতি ও সরবরাহ পরিকল্পনায় ব্যবহার করা সম্ভব।
খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি বলেছেন, ভাত বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই মানুষের খাদ্যাভ্যাস, চালের চাহিদা ও ভোগের ধরন সম্পর্কে সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতি প্রণয়ন করা জরুরি। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আতপ চালের ব্যবহার ও চাহিদা সম্পর্কে গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় খাদ্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ হলরুমে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) আয়োজিত “A Study on the Consumption and Demand for Non-aromatic White Rice (Atap Chal) in Selected Areas of Bangladesh” শীর্ষক গবেষণার ইনসেপশন ওয়ার্কশপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও ভিন্নধর্মী আলোচনায় অংশ নিতে পেরে তিনি আনন্দিত। দেশের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের বড় দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় আতপ চালের ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরিতে এ চাল ব্যবহৃত হয়। তবে কয়েকটি অঞ্চলের চিত্র দিয়ে পুরো দেশের আতপ চালের ভোগ ও চাহিদা বোঝা সম্ভব নয়। তাই সারা দেশে এ চালের ব্যবহার ও চাহিদার ধরন সম্পর্কে গবেষণা প্রয়োজন।
খাদ্যমন্ত্রী আরও বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু খাদ্যের মজুদ নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজন, পছন্দ ও পুষ্টিগত চাহিদাকেও খাদ্য পরিকল্পনায় বিবেচনায় নিতে হবে। গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যৎ খাদ্য পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি-প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের গবেষণায় অঞ্চলভিত্তিক ভোগের তথ্য, ভোক্তার পছন্দ, চালের ধরন, পুষ্টিমান এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিশ্লেষণ করে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন পরিকল্পনা, ধান সংগ্রহ, মজুদ ব্যবস্থাপনা ও বাজারের চাহিদা নির্ধারণেও এসব তথ্য কাজে লাগতে পারে।
আতপ ও সিদ্ধ চালের পুষ্টিগত পার্থক্য নিয়েও মন্ত্রী গবেষকদের কাছে প্রশ্ন করেন। চাল অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত বা একাধিকবার সিদ্ধ করার ক্ষেত্রে পুষ্টিমান কতটা পরিবর্তিত হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য কোন প্রক্রিয়ায় পুষ্টি বেশি সংরক্ষিত থাকে—তা গবেষণার মাধ্যমে নিরূপণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
আন্তর্জাতিক খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণা অনুযায়ী, চালের তুষ ও ভুসির স্তর অতিরিক্ত মসৃণকরণ বা পালিশের মাধ্যমে অপসারণ করলে ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কমতে পারে। বিশেষ করে থায়ামিন, নিয়াসিনসহ বি-গ্রুপের কিছু ভিটামিন মিলিং ও পালিশের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অন্যদিকে ধান সিদ্ধ বা parboiling করার সময় ভুসি ও অঙ্কুরের কিছু পুষ্টি উপাদান চালের শাঁসে স্থানান্তরিত হয়। ফলে সিদ্ধ চাল এসব পুষ্টি ধরে রাখতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হতে পারে।
তবে রান্নার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করে সেই পানি ফেলে দিলে পানিতে দ্রবণীয় কিছু ভিটামিন ও খনিজের ক্ষতি হতে পারে। ফলে চালের পুষ্টিমান নির্ধারণে শুধু কতবার সিদ্ধ করা হয়েছে তা নয়, ধান সিদ্ধ করার পদ্ধতি, মিলিংয়ের মাত্রা এবং রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এমপি। সভাপতিত্ব করেন খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। স্বাগত বক্তব্য দেন এফপিএমইউ-এর মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান।
গবেষণার কনসেপ্ট নোট ও প্রাথমিক বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন এফপিএমইউ-এর সহযোগী গবেষণা পরিচালক মো. মাহিনুর ইসলাম।
ওয়ার্কশপে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, খুলনা ও সিলেটের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
আলোচনায় আতপ চালের ভোগ, ভোক্তার পছন্দ, আঞ্চলিক চাহিদা, পুষ্টিমান এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপণের বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়। আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় চালের গুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের চালের ভোগ ও চাহিদার সঠিক চিত্র জানা খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে অঞ্চলভেদে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও চালের পছন্দের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার ফলাফল কাজে লাগানো গেলে ভবিষ্যৎ খাদ্যনীতি আরও তথ্যভিত্তিক করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিও শক্তিশালী হতে পারে।
//ডিবিটেক/আইআই/সম্পাদিত/আউটপুট//





