শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের পথে ইউরোপ

শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের পথে ইউরোপ
১৪ জুলাই, ২০২৬ ২০:০২  

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের এক নতুন প্রতিবেদনের পর ইউরোপে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন। তিনি বলেন, "এটি স্পষ্ট যে প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমাদের বয়স-উপযুক্ত নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। বিষয়টি এমন নয় যে শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারছে কি না; বরং প্রশ্ন হলো সোশ্যাল মিডিয়া কখন এবং কীভাবে আমাদের শিশুদের নাগাল পাচ্ছে।"

শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. ইয়র্গ এম. ফেগার্ট এবং মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. মারিয়া মেলচিওরের যৌথভাবে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে কিছু আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। পুরো ইউরোপজুড়ে শিশুরা এখন দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশুই সামাজিক-আবেগীয় বিকাশজনিত সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে, যার ফলে তাদের ঘুম ও মনোযোগের সমস্যা এবং বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে- ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যেন ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বাবা-মা বা শিক্ষকের তত্ত্বাবধান ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য কেবল নির্দিষ্ট কিছু নিরাপত্তা ফিচার সংবলিত (যেমন- ইনফিনিট স্ক্রোলিং বা টানা স্ক্রোল করার সুবিধায় সীমাবদ্ধতা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন বা মোবাইল-টেলিভিশন থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য ২০২৪ সালেই অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আইন কার্যকর করেছে।

অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচকেরা বলছেন যে, শিশুরা খুব সহজেই বয়স নিয়ে মিথ্যা বলে বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে এই নিয়ম এড়িয়ে যেতে পারে। এই ফাঁকি রোধ করতে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের ন্যূনতম বয়সসীমা আইন লঙ্ঘনকারী সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ৯ কোটি ৯০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার) করার ঘোষণা দিয়েছে।

ইউরোপ যদি এমন কোনো আইন পাস করে, তবে তা হবে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। এই জোটে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের বসবাস, যার মধ্যে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ মানুষের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। তবে এই ধরনের আইন তৈরি করতে ব্লকের অন্তর্ভুক্ত ২৭টি দেশেরই সম্মতি ও আলোচনার প্রয়োজন হবে, যা বেশ সময়সাপেক্ষ।

তবে এই প্রতিবেদনটিকে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা বা ‘টিপিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফন ডার লেইন বলেন, "আমরা যত বেশি জানতে পারছি এবং আমাদের শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব যত বেশি দেখছি, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার যুক্তি ততটাই জোরালো হচ্ছে।" ইইউ কমিশন এখন এই প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করবে এবং আগামী গ্রীষ্মের পর এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা পেশ করবে।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।   সূত্র: এনগ্যাজেট