প্রায় ৯ হাজার এআই ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেবে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস

প্রায় ৯ হাজার এআই ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেবে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১০:২০  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দাপটে ভারতের ৩১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রথাগত আইটি ও আউটসোর্সিং সেবা খাত হুমকির মুখে পড়তে পারে- বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কার মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রণকৌশল নিয়ে হাজির হয়েছে ভারতের বৃহত্তম সফটওয়্যার পরিষেবা প্রতিষ্ঠান টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস)। এআই প্রযুক্তিকে ব্যবসার প্রতিপক্ষ না ভেবে, এর মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক খাত তৈরির লক্ষ্যে ৮,৯০০ জন পর্যন্ত ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ (এফডিই)-এর একটি বিশেষ দল গঠন এবং এআই স্টার্টআপ অধিগ্রহণের জোরালো পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিসিএস-এর দুই শীর্ষ নির্বাহী এই তথ্য জানিয়েছেন।

আইটি খাতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের উদ্বেগ ছিল যে, এআই প্রযুক্তির কারণে প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কমবে, প্রকল্পের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অজুহাতে ক্লায়েন্টরা সেবার দাম কমিয়ে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করবে। তবে এই ধারণাকে পাশ কাটিয়ে টিসিএস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে কৃতিবাসন বলেন, "আমরা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি যেন আমাদের মোট কর্মীবাহিনীর অন্তত ১ থেকে ১.৫ শতাংশ কর্মী ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ বা এফডিই হিসেবে কাজ করতে পারেন।"

চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসের শেষ নাগাদ টিসিএস-এর মোট কর্মী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৫,৯০০ থেকে ৮,৯০০ জন কর্মীর সমান। তবে এই বিশেষ দলের জন্য কোম্পানিটি বাইরে থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ করবে, নাকি বর্তমান কর্মীদেরই নতুন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলবে—সে বিষয়ে কৃতিবাসন সুনির্দিষ্ট কিছু জানাননি।

কী এই ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’?
ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়াররা মূলত ক্লায়েন্ট বা গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করেন। তারা গ্রাহকদের ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী এআই টুলের ব্যবহার দ্রুততর করা এবং নির্দিষ্ট ব্যবসার উপযোগী করে এআই সিস্টেমের নকশা তৈরিতে সাহায্য করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে আইটি খাতে সাধারণ কর্মসংস্থান কমলেও, এই বিশেষ পদের নিয়োগ এখন বিশ্বজুড়ে এক নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে টিসিএস মূলত ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় নামছে, যারা ইতিমধ্যেই তাদের গ্রাহকদের এআই টুল ব্যবহারে সহায়তার জন্য এই ধরণের ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের পরিধি বাড়িয়েছে।

মুম্বাই-ভিত্তিক এই আইটি জায়ান্টটি একই সাথে এআই, ডেটা সিকিউরিটি এবং সাইবার সিকিউরিটি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ বা কিনে নেওয়ার জন্য মূল্যায়ন শুরু করেছে। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে টিসিএস মূলত অর্গানিক গ্রোথ বা নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে আসছিল এবং ২০২৩-২০২৪ সালের দিকে তারা বড় কোনো অধিগ্রহণ করেনি। তবে ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে তারা এই নীতি পরিবর্তন করে নতুন স্টার্টআপ কেনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

টিসিএস-এর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) সমীর সেকসারিয়া বলেন, "আমাদের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও উন্নত করতে সাহায্য করবে, এমন সম্ভাবনাগুলোই আমরা এখন খুঁজছি।"

এআই কি আউটসোর্সিংয়ের বন্ধু নাকি শত্রু?
এআই প্রযুক্তি আউটসোর্সিংয়ের ব্যবসায়িক মডেলকে ধ্বংস করে দেবে—এমন আশঙ্কা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন সিইও কৃতিবাসন। তিনি যুক্তি দেখান যে, এআই সিস্টেমগুলোকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে একীভূত এবং স্থাপন করার জন্য এখনও টিসিএস-এর মতো দক্ষ পার্টনারদের প্রয়োজন হবে।

কৃতিবাসন বলেন, "যেকোনো এআই সিস্টেমকে কার্যকর করতে হলে গ্রাহকের বর্তমান কাজের পরিবেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এখানেই আমরা অন্যদের চেয়ে আলাদা। এটি সস্তা শ্রম বা খরচের পার্থক্যের বিষয় নয়, এটি মূলত আমাদের তৈরি করা বিশাল দক্ষ কর্মী বাহিনীর শক্তির ওপর নির্ভরশীল।" তিনি আরও যোগ করেন, কোম্পানিগুলো এখন একক কোনো এআই-এর ওপর নির্ভর না করে একাধিক এআই মডেল ব্যবহার করছে, আর সেগুলোকে বিদ্যমান সিস্টেমের সাথে যুক্ত করা এবং ডেটা প্রবাহের সঠিক ব্যবস্থাপনা করার কাজটি টিসিএস-এর মতোই আইটি পার্টনারদের করতে হবে।

অবশ্য চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে টিসিএস-এর বার্ষিক এআই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি গত প্রান্তিকের ২৮% থেকে কমে ১৩%-এ নেমে এসেছে। কৃতিবাসন জানান, দীর্ঘমেয়াদে তিনি প্রতি প্রান্তিকে প্রায় ২৫% প্রবৃদ্ধি দেখতে চান, তবে এই প্রবৃদ্ধির গতিপথ সব সময় এক সরলরেখায় চলবে না।

সিএফও সেকসারিয়া জানিয়েছেন, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এআই প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার জন্য টিসিএস প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ব্যয় করছে। এই বরাদ্দের মূল লক্ষ্য হলো কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, লক্ষ্যভিত্তিক নিয়োগ এবং এআই-নেটিভ প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত জনবল তৈরি করা।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।   সূত্র: রয়টার্স