জেনেভা ডায়েরি:
বাংলাদেশের নাম ঘোষণা হলো, মঞ্চে উঠল না কেউ
‘হার পাওয়ার’ চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু জেনেভায় খুঁজে পাওয়া গেল না বাংলাদেশকে!
১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, আইসিটি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কোনো না কোনোভাবে কাজ করছি।
তাই আজকের লেখাটি অন্যকে প্রশ্ন করার আগে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে শুরু করা ভালো।
আমি দুঃখিত।
আমি লজ্জিতও।
আমি ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্প সম্পর্কে জানতাম না।
বাংলাদেশে নারীর প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষমতায়ন নিয়ে এত বড় একটি সরকারি প্রকল্প হয়েছে, হাজার হাজার নারীকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর্যায়ে পৌঁছেছে, অথচ আমি এর বিস্তারিত জানতাম না।
এ অজ্ঞতা আমার।
কোনো অজুহাত দেব না।
কিন্তু জেনেভায় শুক্রবার সকালে যা ঘটল, তার পর আমার ব্যক্তিগত অজ্ঞতার চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ কি নিজের সাফল্যের খবর নিজেই রাখে?
আমি তখন জেনেভার পালেক্সপোর রুম সি-তে বসে আছি।
ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি বা ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ২০২৬।
সামনে ডব্লিউএসআইএস প্রাইজেস চ্যাম্পিয়নস সেরিমনি।
সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী ১০ জুলাই সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রুম সি-তেই এই চ্যাম্পিয়নস সেরিমনি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
একটির পর একটি দেশের নাম ঘোষণা হচ্ছে।
প্রকল্পের নাম বলা হচ্ছে।
প্রতিনিধিরা উঠে যাচ্ছেন।
মঞ্চে দাঁড়াচ্ছেন।
স্বীকৃতি নিচ্ছেন।
ছবি তুলছেন।
হাততালি হচ্ছে।
হঠাৎ শুনলাম বাংলাদেশের নাম।
Her Power Project.
বাংলাদেশ।
ঘোষণা এলো, বাংলাদেশকে মঞ্চে এগিয়ে আসতে বলা হচ্ছে।
আমি একটু সোজা হয়ে বসলাম।
নিজের দেশের নাম বিদেশের কোনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উচ্চারিত হলে আমাদের শরীরের ভেতরে সম্ভবত একটি ছোট্ট জাতীয়তাবোধের সুইচ আছে।
সেটি নিজে থেকেই অন হয়ে যায়।
ভাবলাম, দেখি বাংলাদেশের কে উঠছেন।
কেউ উঠলেন না।
আমি আবার তাকালাম।
হয়তো পেছনের সারিতে আছেন।
হয়তো পাশের দরজা দিয়ে আসছেন।
হয়তো মোবাইল ফোনে ব্যস্ত ছিলেন।
হয়তো ঘোষণা শুনতে পাননি।
কয়েক সেকেন্ড গেল।
কেউ নেই।
বাংলাদেশের ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্পকে ডব্লিউএসআইএস প্রাইজেস ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করেছে আইটিইউ। প্রকল্পটি ডব্লিউএসআইএস অ্যাকশন লাইন সি৭-এর ই-এমপ্লয়মেন্ট ক্যাটাগরির সঙ্গে যুক্ত।
অর্থাৎ এটি আমার কানে ভুল শোনা কোনো ঘোষণা ছিল না।
বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রকল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
কিন্তু সেই স্বীকৃতির মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষে মঞ্চে ওঠার মানুষটিকে আমি অন্তত দেখতে পেলাম না।
‘হোয়াট হ্যাপেন্ড টু বাংলাদেশ?’
আমার পাশে এবং আশপাশে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি বসে ছিলেন।
তাঁদের একজন আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন,
“What happened to Bangladesh?”
আমি কী উত্তর দেব?
বলব, আমি জানি না?
তারপর তিনি প্রায় স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
“Why don't you go to the stage?”
এই প্রশ্নে আমি আরও বিব্রত হলাম।
আমার গলায় সম্মেলনের পরিচয়পত্র।
আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
ডব্লিউএসআইএস প্রক্রিয়ার সঙ্গে বহু বছর ধরে যুক্ত।
এর আগে ডব্লিউএসআইএস প্রাইজ ও একাধিক চ্যাম্পিয়ন স্বীকৃতির অভিজ্ঞতাও আছে।
কিন্তু আমি কে?
আমি কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি?
না।
আমি কি হার পাওয়ার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক?
না।
প্রকল্পটি কি আমাকে লিখিতভাবে কোনো দায়িত্ব দিয়েছে?
না।
তাহলে আমি কীভাবে মঞ্চে উঠব?
শুধু বাংলাদেশের পাসপোর্ট আছে বলে কি রাষ্ট্রের একটি প্রকল্পের স্বীকৃতি গ্রহণ করা যায়?
আমার মনে হলো, মঞ্চে উঠে যাওয়া হয়তো আবেগের দিক থেকে দেশপ্রেম হতো।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে সেটি দায়িত্বহীনতা।
আমি উঠিনি।
সত্যি বলতে, তখন আমি চেয়ার থেকে একটু ছোট হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
সম্ভব হলে অদৃশ্য হয়ে যেতাম।
কারণ একজন বিদেশি প্রতিনিধি আমার কাছে জানতে চাইছেন, বাংলাদেশের কী হয়েছে।
আর আমার কাছে উত্তর নেই।
এ এক অদ্ভুত বিব্রতবোধ।
বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে বলে নয়।
বাংলাদেশ সফল হয়েছে বলেই।
আমাদের প্রকল্প স্বীকৃতি পেয়েছে।
আমাদের নাম ঘোষণা হয়েছে।
শুধু মঞ্চে আমাদের পাওয়া যাচ্ছে না।
তারপর আমি গুগল করলাম
আমার অজ্ঞতার চিকিৎসা করার জন্য যা করা দরকার, সঙ্গে সঙ্গে সেটিই করলাম।
হার পাওয়ার প্রকল্পের ওয়েবসাইট খুললাম।
প্রথমে দেখলাম স্লোগান:
‘প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর ক্ষমতায়ন’।
তারপর উদ্দেশ্য পড়লাম।
তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ও সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে টেকসই ক্ষমতায়ন।
পড়তে পড়তে আমার নিজের ওপরই বিরক্তি হচ্ছিল।
এত বড় কাজ, আমি জানি না কেন?
প্রকল্পের নিজস্ব ওয়েবসাইট বলছে, ১৩০টি উপজেলায় চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ২৫ হাজার ১২৫ নারীকে পাঁচ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে আইটি সার্ভিস প্রোভাইডার ও ওমেন ফ্রিল্যান্সার ক্যাটাগরিতে ১০ হাজার ৪০০ জন করে, ওমেন কল সেন্টার এজেন্ট হিসেবে ১ হাজার ৭৫ জন এবং ওমেন ই-কমার্স প্রফেশনাল হিসেবে ৩ হাজার ২৫০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা। প্রশিক্ষণের পর এক মাসের মেন্টরশিপ, ৪৬টি সেমিনার, একটি একক নারী উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও চাকরি মেলার পরিকল্পনাও প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্যের অংশ।
আইটিইউতে জমা দেওয়া প্রকল্পের তথ্যে ২৫ হাজার ১২৫ নারীকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই নথির ‘রেজাল্টস’ অংশে ১০ হাজার ৫০০ নারীকে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করার কথা এবং ‘ইমপ্যাক্ট’ অংশে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে ৬ হাজার ৭২০ নারীকে আইসিটি ব্যবসায় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে ক্ষমতায়িত করার কথা বলা হয়েছে।
এখানে সাংবাদিক হিসেবে একটি কথা পরিষ্কার করা জরুরি।
লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জন এক জিনিস নয়।
২৫ হাজার ১২৫ হলো ঘোষিত লক্ষ্য।
১০ হাজার ৫০০ এবং ৬ হাজার ৭২০ হলো আইটিইউতে উপস্থাপিত ফলাফল ও প্রভাবের সংখ্যা।
আমি বরং চাই, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর প্রকল্পটি আরও বিস্তারিতভাবে তার ফলাফল প্রকাশ করুক।
কতজন প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন?
কতজন আয় করছেন?
প্রশিক্ষণের ছয় মাস বা এক বছর পর কতজন পেশায় টিকে আছেন?
গড় আয় কত বেড়েছে?
গ্রামীণ নারী, প্রতিবন্ধী নারী এবং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কত?
একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে তাকে শুধু ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানানো দায়িত্ব নয়।
তার দাবি ও ফলাফলকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দায়িত্ব।
কারণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রশ্ন বন্ধ করে না।
বরং আরও ভালো প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে।
প্রথম প্রশ্ন: জেনেভায় কে আসার কথা ছিল?
এবার আমার কয়েকটি খুব সাধারণ প্রশ্ন।
হার পাওয়ার প্রকল্প কি ডব্লিউএসআইএস চ্যাম্পিয়নস সেরিমনির আনুষ্ঠানিক তথ্য পেয়েছিল?
পেয়ে থাকলে প্রকল্পের পক্ষ থেকে জেনেভায় কেউ আসার সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি?
কোনো কর্মকর্তা মনোনীত হয়েছিলেন?
তাঁর ভ্রমণ অনুমোদন হয়েছিল?
ভিসা হয়েছিল?
টিকিট হয়েছিল?
শেষ মুহূর্তে কোনো সমস্যা হয়েছিল?
আমি উত্তর জানি না।
তাই অভিযোগ করছি না।
প্রশ্ন করছি।
কারণ কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকার অনেক যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে।
ভিসা সমস্যা হতে পারে।
ভ্রমণ অনুমোদন দেরি হতে পারে।
সিডিউল নিয়ে বিভ্রান্তি হতে পারে।
আইটিইউর সঙ্গে যোগাযোগে ভুল হতে পারে।
শেষ মুহূর্তে অসুস্থতা হতে পারে।
কিন্তু এর যেকোনো একটি ঘটে থাকলে আমরা কি বিকল্প ব্যবস্থা করেছিলাম?
এটাই মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশ মিশনকে কি জানানো হয়েছিল?
জেনেভায় বাংলাদেশের একটি স্থায়ী মিশন রয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব জাতিসংঘের জেনেভা কার্যালয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ও যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত।
তাহলে হার পাওয়ার প্রকল্পের কেউ জেনেভায় আসতে না পারলে স্থায়ী মিশনকে কি জানানো হয়েছিল?
একজন কর্মকর্তা কি দশ মিনিটের জন্য রুম সি-তে যেতে পারতেন না?
আমি জানি না।
হয়তো মিশনকে জানানোই হয়নি।
হয়তো জানানো হয়েছিল, কিন্তু অন্য কোনো দায়িত্ব ছিল।
হয়তো আইটিইউর প্রটোকল অনুযায়ী অন্য কাউকে গ্রহণের অনুমতি ছিল না।
এসবই সম্ভব।
তাই আবার বলছি, আমি রায় দিচ্ছি না।
কিন্তু একটি সরকারি প্রকল্প যখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তখন প্রকল্প, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট স্থায়ী মিশনের মধ্যে একটি সহজ সমন্বয় পদ্ধতি থাকা কি খুব বেশি প্রত্যাশা?
ই-মেইল।
ফোন।
হোয়াটসঅ্যাপ।
একটি ছোট চিঠি।
‘আমাদের প্রতিনিধি যেতে পারছেন না। বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের অমুক কর্মকর্তা আমাদের পক্ষে উপস্থিত থাকবেন।’
এতটুকু?
আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলছি।
ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে কথা বলছি।
স্মার্ট গভর্ন্যান্স নিয়ে কথা বলছি।
অথচ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গ্রহণের জন্য একজন মানুষকে একটি কক্ষে পৌঁছাতে পারছি না?
প্রশ্নটি একটু নিষ্ঠুর।
কিন্তু প্রশ্নটি করা দরকার।
হার পাওয়ার আমাকে বিব্রত করেনি
শিরোনাম দেখে হার পাওয়ার প্রকল্পের বন্ধুরা হয়তো আমার ওপর রাগ করতে পারেন।
তাঁদের বলি, আপনারা আমাকে বিব্রত করেননি।
আপনাদের প্রকল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের গর্ব।
আইটিইউর ২০২৬ সালের তালিকায় হার পাওয়ার প্রকল্পকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। প্রকল্পটির সরকারি পরিচয়ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকায় স্পষ্ট।
আমাকে বিব্রত করেছে আমাদের সমন্বয়ের অদৃশ্য ফাঁক।
এটি বাংলাদেশের পুরোনো রোগ।
এক প্রতিষ্ঠান জানে না অন্য প্রতিষ্ঠান কী করছে।
একটি প্রকল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, কিন্তু দেশের সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব কাঠামো হয়তো জানে না।
কোনো কর্মকর্তা বিদেশে আসেন, দেশের অন্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
সুশীল সমাজ আলাদা।
সরকার আলাদা।
বেসরকারি খাত আলাদা।
আমরা সবাই বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে একই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ঘুরছি।
কিন্তু একে অন্যকে অনেক সময় চিনিই না।
তারপর আমরা মঞ্চে বলি,
Whole-of-society approach.
Multistakeholder collaboration.
Breaking silos.
জেনেভার সভাকক্ষে শব্দগুলো খুব সুন্দর শোনায়।
বাংলাদেশের নাম ঘোষণা হওয়ার পর যখন কেউ উঠে দাঁড়ায় না, তখন শব্দগুলোর প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
আমার শেষ প্রশ্নটি একটু ব্যক্তিগত
সকালে রুম সি-তে বসে আমি সত্যিই বিব্রত হয়েছিলাম।
একজন বিদেশি সরকারি প্রতিনিধি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন,
‘বাংলাদেশের কী হয়েছে?’
আমাকে বলছেন,
‘আপনি যান না কেন?’
আমি যেতে পারছি না।
কারণ আমার কোনো ম্যান্ডেট নেই।
আমি বাংলাদেশের নাগরিক।
আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি।
আমি বাংলাদেশের সাফল্যে আনন্দিত।
কিন্তু রাষ্ট্রের হয়ে পুরস্কার গ্রহণের অধিকার আমার নেই।
তখন আমার মনে একটি খানিকটা রসিক, খানিকটা রাগের প্রশ্ন এসেছে।
হার পাওয়ার প্রকল্পকে কে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, জেনেভার সকালে আমাকে এভাবে বিব্রত করে চেয়ারেই অদৃশ্য হওয়ার চেষ্টা করাতে?
অবশ্যই উত্তর হলো, কেউ দেয়নি।
সম্ভবত কেউ এমনটি চায়ওনি।
এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়।
সম্ভবত এটি শুধু সমন্বয়হীনতা।
কিন্তু প্রশাসনের একটি বড় সত্য হলো, সব বিব্রতকর ঘটনার পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না।
কখনো কখনো দায়িত্বটি কার, সেটি কেউ ঠিক করে না বলেই ঘটনা ঘটে।
হার পাওয়ারের নারীরা প্রযুক্তি শিখেছেন।
কাজ শিখেছেন।
উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তাঁদের কাজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের নাম তুলেছে।
তাঁদের অভিনন্দন।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণকারী নারীদেরও অভিনন্দন।
কিন্তু সেই নারীদের অর্জনের নামে যখন জেনেভায় বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন অন্তত একজন মানুষের উঠে দাঁড়ানো দরকার ছিল।
আমার জন্য নয়।
সরকারের জন্যও শুধু নয়।
ওই ২৫ হাজার ১২৫ নারীর স্বপ্নের জন্য।
বাংলাদেশের নাম ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে নীরবতা খুব দীর্ঘ ছিল না।
হয়তো কয়েক সেকেন্ড।
তারপর অনুষ্ঠান সামনে এগিয়ে গেছে।
পরের দেশের নাম এসেছে।
পরের প্রতিনিধি মঞ্চে উঠেছেন।
পৃথিবী থেমে থাকেনি।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি নিষ্ঠুর নিয়ম আছে।
আপনি উপস্থিত না থাকলে অনুষ্ঠান আপনার জন্য অপেক্ষা করে না।
বাংলাদেশেরও এটি মনে রাখা দরকার।
কারণ সাফল্য অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্যের গল্প পৃথিবীকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।
আর যখন পৃথিবী নিজেই আপনার নাম ঘোষণা করে মঞ্চে ডাকে, তখন অন্তত একজনকে উঠে দাঁড়াতে হয়।
হার পাওয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
এখন আমার প্রশ্ন খুব ছোট।
বাংলাদেশ, আপনি তখন কোথায় ছিলেন?
//ডিবিটেক/বিআর/এমআই//





