হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচি:
সাফল্যের ইতিহাসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষত
সম্প্রতি দেশে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যু এবং এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। যা ঘটেছে তা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং অত্যন্ত মর্মান্তিক। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই-এর আওতায় গত কয়েক দশকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, সেখানে ২০২৬ সালে এসে টিকার অভাবে শিশুর মৃত্যু হওয়াটা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই কর্মসূচি বিগত সকল সরকারের আমলেই নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত ছিল এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে কখনোই বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠেনি। অথচ এখন কেন টিকার সংকট বা তদারকির অভাব দেখা দিল, তা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বরাদ্দকৃত ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ অতীতের কোনো সরকারের সময় এমন বিপর্যয় দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে টিকাদান কর্মসূচির সফলতা ঈর্ষণীয়। এই কার্যক্রমের মাধ্যমেই দেশ থেকে গুটিবসন্ত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে, পোলিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং যক্ষ্মা ও ধনুষ্টংকারের মতো ঘাতক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। এই সাফল্যের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF), আইসিডিডিআরবি এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন বা গ্যাভি (GAVI)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা কাজ করেছে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বৈশ্বিক ভ্যাকসিন জোট উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জীবন রক্ষাকারী টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করে। কোনো দেশের টিকা কেনার সামর্থ্য না থাকলেও এই জোটের মাধ্যমে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। ফলে অর্থ সংকটের কারণে বাংলাদেশে টিকা আমদানি সম্ভব হয়নি—এমন যুক্তি বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ইপিআই কার্যক্রমের যাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ৭ই এপ্রিল এটি স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছিল। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার ও হাম—এই ছয়টি রোগ প্রতিরোধে এর কার্যক্রম ছিল মাত্র ২ শতাংশের নিচে। এরপর ১৯৯০ সালের মধ্যে এটি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয় এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ক্রমান্বয়ে এই কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি, পেন্টাভ্যালেন্ট, নিউমোকক্কাল এবং অতি সম্প্রতি এইচপিভি টিকার মতো আধুনিক সব ভ্যাকসিন যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ ও ২০১২ সালে দেশ ‘গ্যাভি বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে এবং ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়। (তথ্য সূত্র : ইপিআই, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আশির দশকের শুরুতে দেশে হামের টিকার কভারেজ ছিল মাত্র ১ শতাংশের মতো। নব্বইয়ের দশকে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত হয় এবং ২০০০ সাল নাগাদ তা ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১০ সালের দিকে এই হার ৯০ শতাংশের কাছাকাছি চলে আসে এবং ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কভারেজ ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশের বেশি কভারেজ থাকলে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে শিশুদের করুণ মৃত্যু এবং টিকার স্বল্পতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা গত কয়েক দশকের কষ্টার্জিত সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চল এবং দুর্গম প্রান্তিক এলাকায় ‘জিরো-ডোজ’ বা টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা কমানোর যে চ্যালেঞ্জ ছিল, তা মোকাবিলায় বড় ধরনের গাফিলতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্যবস্থার মধ্যে কেন এই ছন্দপতন ঘটল, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ জেষ্ঠ্য সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ



