২০ বছরে এক ইঞ্চিও এগোয়নি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অটোমেশন
২০২০ সালে ই-অকশন (অনলাইন নিলাম) চালু করেও পিছু হটতে হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে। ফিরে যেতে হয় ম্যানুয়াল-অটোমেশনের হাইব্রিড পদ্ধতিতে। অটোমেশন স্বয়ংক্রিয় কিংবা পুরোপুরি অযান্ত্রিক না হওয়ায় চরম হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, গত ২০ বছরে এক ইঞ্চিও এগোয়নি এই প্রতিষ্ঠানটির অটোমেশন প্রক্রিয়া।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর)গুলশানের পুলিশ প্লাজায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার সম্পর্কিত এক গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ করেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘কার্যকর কর নীতি ও ব্যবস্থাপনা আনতে এনবিআর সংস্কার’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও এনবিআর সংস্কার কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ। এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবীরের সঞ্চালনায় এতে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ-সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, রাজস্ব আদায়ের বড় জায়গা হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এনবিআরের সাবেক সদস্য ও বর্তমান এনবিআর সংস্কার কমিটির সদস্য ফরিদ উদ্দিন আজ থেকে ২০ বছর আগে সেখানকার কমিশনার ছিলেন। তিনি সেখানে অটোমেশন যতদূর করে আসছেন তাতেই শেষ। এরপর আর এক ইঞ্চিও এগোয়নি। গার্মেন্টেসের জন্য গ্রিন চ্যানেল করার কথা ছিল। সেটাও এগোয়নি।
মাহবুব অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যে এর কর্মকাণ্ডের অর্ধেক অটোমেশন ও অর্ধেক ম্যানুয়াল। ব্যবসায়ীরা বারবার বলছেন, এটিকে হয় পুরোপুরি অটোমেশন, না হলে ম্যানুয়াল করুক।
পুরোপুরি অটোমেশন না হওয়ায় কী ধরনের সমস্যা হয় তার উদাহরণ দেন মাহবুব। তিনি বলেন, কাস্টম হাউসে দু-তিনটি শাখা মিলিয়ে একজন কম্পিউটার অপারেটর আছেন। সেবা নিতে সেই অপারেটরের সামনে প্রায় ২০ জন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অন্যখানে কম্পিউটার থাকলেও দেখা যায় প্রিন্টার নেই। ফলে ওই লাইনেই দিনের অর্ধেক চলে যায়। যদি ম্যানুয়াল হতো তাহলে শিটে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর নিয়ে চলে আসা যেত।
এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার হয়েছে পলিসি ও রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট দিয়ে। এটার কার্যকারিতা আমরা এখন পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারছি না। যে সংস্কার হয়েছে সেটার আরও প্রচার দরকার। দেশের এক শতাংশ মানুষ এটা সম্পর্কে জানে না।’
সভায় রাজস্ব খাত সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, তার আলোকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন এনবিআর সংস্কারের জন্য সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কমিটির সুপারিশ ছিল এ রকম—নীতি প্রণয়ন কমিটিতে বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি খাতের কিছু ব্যক্তিকে রাখতে হবে। এ ছাড়া যে নীতি নেয়া হবে, তা অন্তত পাঁচ বছর অব্যাহত রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যে সংস্কার সুপারিশ দিয়েছিলাম, বাস্তবে তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। যদি কোনও বিদ্বেষ বা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে এনবিআরকে দুই ভাগ করা হয়, তবে তা জাতির জন্য ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।’
কমিটির আরেক সদস্য ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, “সঠিকভাবে সুপারিশ বাস্তবায়ন মূলত রাজনৈতিক কমিটমেন্টের বিষয়। নইলে সংস্কার কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।”
অনুষ্ঠানে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যদি অটোমেশন হয় তবে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু অটোমেশন শুধু এনবিআরের হলে হবে না, এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও হতে হবে।
এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এনবিআর সংস্কারের কথা বলে আসছি। এটাকে একসময় অরণ্যে রোদন মনে হয়েছে। যারা পলিসি করে তারা কর সংগ্রহ করতে পারে না। এনবিআর সংস্কার কমিটি খুব ভালো কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব খাতে পরিবর্তন আসবে।’
হিসাববিদ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া জানান, এক কার্যালয়ে কর-ভ্যাট নেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। তাতে সরকারের ব্যয় সংকোচন হবে। রাজস্ব আদায়ও সহজ হবে। ব্যবসায়ীদের রাজস্ব দিতে অনেকগুলো কার্যালয়ে ধরণা দিতে হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুই ভাগে বিভক্ত করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে না। রাজস্ব বোর্ড ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট–সংক্রান্ত রাজস্ব নীতিসমূহ দীর্ঘমেয়াদি, কমপক্ষে পাঁচ বছর মেয়াদি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আইন, এসআরও, বিধিবিধান, প্রজ্ঞাপন জারি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত নিতে হবে।’



