জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন
-
বায়েরা স্টেজ-সি কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে
-
ডিসেম্বরে ৩০০ মেগাওয়াট পরীক্ষামূলক সরবরাহের প্রত্যাশা
-
বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে আরও পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রয়োজন
বায়েরা স্টেজ-সি কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে
ডিসেম্বরে ৩০০ মেগাওয়াট পরীক্ষামূলক সরবরাহের প্রত্যাশা
বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে আরও পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রয়োজন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। প্রয়োজনীয় ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর ইউনিটটিতে ‘স্টেজ-সি’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এই ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো, টারবাইন-জেনারেটর ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান। তিনি জানান, বায়েরার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, কমিশনিং কার্যক্রম ও কারিগরি পরীক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর।
ফিজিক্যাল স্টার্টআপের পর নতুন ধাপ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বায়েরার কাছে জমা দেওয়ার পর স্টেজ-সি পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পাওয়া যায়।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, ফিজিক্যাল স্টার্টআপের ধাপ পেরিয়ে কেন্দ্রটি এখন পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়েরা ট্রায়াল অপারেশনাল অনুমোদন দিয়েছে।
রিঅ্যাক্টর থেকে জেনারেটর—যা যাচাই হবে
স্টেজ-সি বা পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কুল্যান্ট ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষা করা হবে।
ড. জাহেদুল হাসান জানান, এসব ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা-ও যাচাই করা হবে। এ পর্যায়ের প্রধান লক্ষ্য হলো কেন্দ্রটির নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা।
রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিশেষ করে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।
পুরো প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বায়েরা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি
স্টেজ-সি পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা। এ প্রক্রিয়ায় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা কম রেখে পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ফলাফল ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হলে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে এ সময়সীমা চূড়ান্ত নয়। পরীক্ষার ফলাফল, কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর তা নির্ভর করবে।
পরীক্ষামূলক সরবরাহ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন এক নয়
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্টেজ-সি পর্যায়ের পরীক্ষা, জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন—তিনটি পৃথক মাইলফলক। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
তাই পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন পাওয়ার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া নয়। জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরীক্ষা চলতে থাকবে।
দুটি ইউনিটে মোট উৎপাদনক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উভয় ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পারমাণবিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে। বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে।
৬০ বছর আয়ুষ্কালের পরিকল্পনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থ্রি-প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। এটি আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত উন্নত প্রযুক্তির একটি শ্রেণি। নকশা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
//ডিবিটেক/এসসি/ডিই ওই//





