ভোরের পাখি ডাকার আগেই যাদের হাত ঘুরে আসে ১৭ কোটি মানুষের আহার!

পূবের আকাশে তখনো লালচে আভা ফুটেনি। কুয়াশা আর শিশিরে ভেজা মাটির পথ ধরে তরতর করে হেঁটে চলেছেন রহিমা বেগম। কাখে জলের কলসি, আর চোখে ঘুমভাঙা স্বপ্নের ঝিলিক। ঘরের ধান সেদ্ধ করা, উঠোনে চাল মেলানো, গোয়ালের গরু সামলানো থেকে শুরু করে হাঁটু পানিতে নেমে আমনের চারা রোপণ সূর্য ওঠার আগেই রহিমার দিনের অর্ধেক কাজ শেষ! এটি […] The post ভোরের পাখি ডাকার আগেই যাদের হাত ঘুরে আসে ১৭ কোটি মানুষের আহার! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

ভোরের পাখি ডাকার আগেই যাদের হাত ঘুরে আসে ১৭ কোটি মানুষের আহার!
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:০০  

পূবের আকাশে তখনো লালচে আভা ফুটেনি। কুয়াশা আর শিশিরে ভেজা মাটির পথ ধরে তরতর করে হেঁটে চলেছেন রহিমা বেগম। কাখে জলের কলসি, আর চোখে ঘুমভাঙা স্বপ্নের ঝিলিক। ঘরের ধান সেদ্ধ করা, উঠোনে চাল মেলানো, গোয়ালের গরু সামলানো থেকে শুরু করে হাঁটু পানিতে নেমে আমনের চারা রোপণ সূর্য ওঠার আগেই রহিমার দিনের অর্ধেক কাজ শেষ! এটি কেবল এক রহিমার গল্প নয়, বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মেহনতি গ্রামীণ নারীর প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর যখন ‘আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস’ আসে, তখন বিশ্বজুড়ে নানা রঙিন আয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের গ্রামের রহিমা, সালেহা কিংবা মালতিদের কাছে দিনটি আসে অন্য যেকোনো সাধারণ দিনের মতোই নীরব কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে।

মেঠোপথে ঘাম ঝরানো গ্রামের নারীরা

আমাদের সমাজের অনেকেই ভাবেন, কৃষিকাজ বুঝি কেবল পুরুষের একচ্ছত্র অধিপত্যের জায়গা। কিন্তু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য! বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিবিএস) তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশের কৃষি খাতের প্রায় ৫৮ শতাংশ শ্রমের সাথে সরাসরি জড়িয়ে আছেন গ্রামীণ নারীরা। ভোর রাতে চুলা জ্বালানো থেকে শুরু করে বিকেলের সূর্য ডোবা পর্যন্ত তাদের ব্যস্ততার শেষ নেই। বীজ সংরক্ষণ, চারা রোপণ, ধান মাড়াই, শাকসবজি চাষ কিংবা গবাদিপশু পালন কৃষি চক্রের প্রতিটি পরতেই চেপে আছে তাদের অদৃশ্য হাতের ছাপ। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মুখের আন্ন সংস্থানে প্রতিদিন তারা যে ঘাম ঝরান, তার কোনো হিসাব হয়তো সরকারি খাতায় নেই, কিন্তু মেঠোপথের ধূলিকণা তার জীবন্ত সাক্ষী।

ফসলের মালিকানা নেই, তবুও অন্নদাত্রী তারাই

রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে পুরো দেশের খাদ্যের জোগান দিলেও কাজের যথাযথ স্বীকৃতি থেকে আজও বঞ্চিত বাংলার নারী কৃষকেরা। জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও দিনশেষে নারীরা পান না ‘কৃষক’ কার্ড কিংবা সরকারি কোনো সহজ কৃষিঋণ। দেশে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ জ্যামিতিক হারে বাড়লেও মাত্র ১৩ শতাংশের কাছাকাছি নারীর নিজস্ব জমির মালিকানা রয়েছে। এমনকি কৃষি মজুরির ক্ষেত্রেও রয়ে গেছে স্পষ্ট বৈষম্য; সমান সময় ও সমান পরিশ্রম দিয়েও পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পান তারা। সমাজ আজও তাদের দেখে ‘কৃষকের স্ত্রী’ বা ‘সহযোগী’ হিসেবে। অথচ এই নারীদের হাত থমকে গেলে সারা দেশের খাদ্যের শৃঙ্খল নিমেষেই ভেঙে পড়তে বাধ্য।

হাঁস-মুরগি আর কুটির শিল্পে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন লড়াই

চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, বাংলার নারীদের হার না মানা মানসিকতা থমকে যেতে শেখেনি। প্রথাগত কৃষির বাইরেও আজ গ্রামীণ অর্থনৈতিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা। বাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগির খামার তৈরি, হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি, দুগ্ধ খামার কিংবা হস্তশিল্প তৈরি করে সংসারের আর্থিক ভিত শক্ত করছেন লাখো নারী। বিশেষ করে উপকূলীয় কিংবা চরাঞ্চলের প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করে তারা যে সাহস দেখাচ্ছেন, তা সত্যই অতুলনীয়। অনেক গ্রামীণ নারী এখন ক্ষুদ্রঋণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেদের উৎপাদিত সামগ্রী সরাসরি হাটে কিংবা স্থানীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করছেন। সংসার সামলে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করার এই তীব্র উদ্দীপনা বাংলার গ্রামগুলোকে সচল রাখছে।

নতুন সকালের প্রত্যাশা

দিনের আলো নিভে গেলে যখন পুরো গ্রাম শান্ত হয়ে আসে, তখনো কুপি কিংবা বাল্বের আলোয় ঘরের শেষ কাজটি সারতে ব্যস্ত থাকেন ওই একই নারী। সবজি কাটতে কাটতে সন্তানকে পড়তে বসানো, কিংবা রাতের খাবার বেড়ে সবাইকে খাইয়ে সবার শেষে ঘুমাতে যাওয়া এই তো তাদের জীবনের প্রতিদিনের গতিপথ। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আসে আর যায়। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির এই দিনে শুধু সভা-সমাবেশ বা ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের ভূমির অধিকার, কাজের সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রাত পেরিয়ে আবার শুভ্র সকাল আসবে। ভোরের পাখি ডাকার আগেই ঘুম থেকে উঠে রহিমারা আবার নেমে পড়বেন চিরচেনা মাটির টানে। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানেন, তাদের হাতের ছোঁয়া না পেলে যে এ দেশের সবুজ মাঠ হাসবে না, আর দেশের কোটি মানুষের অন্নসংস্থানের চাকাও ঘুরা বন্ধ হয়ে যাবে!

The post ভোরের পাখি ডাকার আগেই যাদের হাত ঘুরে আসে ১৭ কোটি মানুষের আহার! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.