সিজিএসের ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ উদ্বোধন; সার্বজনীন কার্ড, খাল খনন ও ২০ হাজার কিমি জলপথের মহা-পরিকল্পনা
প্রযুক্তি রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় জোর দিয়ে বাংলাদেশকে ‘ইনভেস্টমেন্ট হাব’ গড়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
- সিজিএস আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ তরুণদের এআই ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে ‘ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের ডাক প্রধানমন্ত্রীর
- সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি, কৃষক, হেলথ ও সমন্বিত ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালুর রূপরেখা; তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োগ পাবেন ৮০ শতাংশ নারীসহ এক লাখ কর্মী
- আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিমি খাল খনন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বা ‘ইনভেস্টমেন্ট হাব’-এ রূপান্তরের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৩ অক্টোবর, শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
সিজিএসের আয়োজনে পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সম্মেলনে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং এক সহস্রাধিক বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়েছেন। সম্মেলনে সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ এবং মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারাসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ কূটনীতিক, গবেষক ও উন্নয়ন অংশীদাররা উপস্থিত ছিলেন।
প্রযুক্তি রূপান্তর, এআই ও তারুণ্যের বিকাশ:
বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রগতির কেন্দ্রে রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। এই জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগাতে ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে গ্রহণ করা হচ্ছে। উদ্ভাবন, স্টার্ট-আপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। আমরা চাই আমাদের তরুণেরা বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিযোগিতা করুক এবং জাতীয় মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ স্থায়ীভাবে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরিত হোক।" তিনি উল্লেখ করেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সন্তানদের চরিত্র গঠন, ক্রীড়া ও মূল্যবোধের পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ থাকবে। প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে বিনামূল্যে স্কুলব্যাগ, ইউনিফর্ম, মিড-ডে মিল ও উপবৃত্তি; পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীশিক্ষার অবৈতনিক সুবিধা সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক নাগরিক সেবা
একপার্যায়ে প্রযুক্তিভিত্তিক সমন্বিত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সংস্কার তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রান্তিক পরিবারগুলোর সুবিধার্থে প্রতিটি মায়ের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক অনুদান পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, চিকিৎসার জন্য ‘হেলথ কার্ড’ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সব সরকারি নাগরিক সেবা একটি ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালু করা হবে। এছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা ও মা-শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তৃণমূল পর্যায়ে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
সবুজ প্রযুক্তি, পানি নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি
দেশের ভৌগোলিক সুরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি পরিবেশবান্ধব ‘লিড সার্টিফাইড’ কারখানার মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে। সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে। কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে আধুনিক সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও রপ্তানিমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খনন, দীর্ঘমেয়াদি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেন তিনি।
বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে যৌথ সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির করিডোরে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক নৌপথ, উপকূলীয় সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি), লজিস্টিকস ও আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অভিন্ন ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক আশ্রয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "মিয়ানমারে যে সংকটের সূচনা, তার টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়কে কার্যকর রাজনৈতিক চাপ ও টেকসই অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হবে।" বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সকল বৈশ্বিক অংশীদারের সাথে কাজ করে যাবে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
//ডিবিটেক/ জেএনও/ ডিএম এন/বিপিসি//





