আকাশসীমা জটিলতা কাটিয়ে 

আপডেট:শুক্রবার আসছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম ইউরেনিয়াম চালান

  • রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান বিকল্প রুটে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছাচ্ছে
  • আকাশসীমা ক্লিয়ারেন্স না দেওয়ার বিষয়টি কারিগরি প্রটোকল বলে বিবিসি উর্দুকে জানায় পাকিস্তান
  • প্রথম ইউনিটের মেকানিক্যাল ত্রুটি ও দ্বিতীয় ইউনিটের চালানে ২০২৭ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্য

আপডেট:শুক্রবার  আসছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম ইউরেনিয়াম চালান
১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩১  

আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি সংক্রান্ত কারিগরি ও পদ্ধতিগত জটিলতা কাটার পর বিকল্প রুটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর কাজ শুরু হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানী বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) সূত্র জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর ২০২৬) শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার পর ইউরেনিয়ামবাহী প্রথম কার্গো ফ্লাইটটি ২ অক্টোবর, শুক্রবার বিকেলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। রাশিয়ার তৈরি বিশ্বের সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের উন্নত VVER-1200 থার্মাল নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর প্রযুক্তিতে নির্মিত এই কেন্দ্রে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জাতীয় শক্তি নিরাপত্তায় এক নতুন সাই-টেক যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম সূত্রে প্রকাশ, আগামী ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৭টি কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে দ্বিতীয় ইউনিটের যাবতীয় পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন হবে।

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম নির্ধারিত সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ না আসায় অভিযোগ ওঠে, পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে পোস্ট দিতেও দেখা গেছে অনেককে। প্রশ্ন উঠে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ইতিবাচক সম্পর্কের পরও দেশটির কেন এমন সিদ্ধান্ত? নির্ধারিত সময়ে ইউরেনিয়াম এর সরবরাহ না পাওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে গেলো কি না, এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।

এমন প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক নয় বরং বিমান চলাচল সংক্রান্ত কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিষয় বলে বিবিসি উর্দুকে জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকলের সাথে সংগতি রাখার বিষয়টিকে, দেশটির আকাশসীমা ব্যবহারের ক্লিয়ারেন্স না দেওয়ার কারণ হিসেবে সামনে এনেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার। তিনি জানান, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়মের প্রতি প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত নির্দেশিকা ও বেসামরিক বিমান চলাচল প্রটোকলের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতি রেখে, একটি মানসম্মত সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক ফ্লাইট এবং ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের সমস্ত আবেদন প্রক্রিয়া করে থাকে। বিমান চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও কারিগরি কারণে ফ্লাইটসূচি পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানান তিনি। হায়দার লিখিত বিবৃতিতে জানান, বিষয়টি ফ্লাইট রুট ও আকাশসীমা অনুমোদনের সঙ্গে সম্পর্কিত কারিগরি ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। যার জন্য মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে এবং এর ফলে ফ্লাইটসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

এর আগে ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে (Unit-1) সফলভাবে ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হয়, যা রূপপুরকে নির্মাণাধীন পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনিং বা উৎপাদন-প্রস্তুতির চূড়ান্ত ধাপে উন্নীত করে। বর্তমানে প্রথম ইউনিটের সেফটি ভালভের ত্রুটি মেরামত ও অভ্যন্তরীণ কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সব প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে প্রথম ইউনিটটি ১,২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছাবে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চালু করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) এবং রাশিয়ার জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (ASE) যৌথ বাস্তবায়নে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রের মেগা তথ্য অনুযায়ী, এটি ২,৪০০ মেগাওয়াট মোট উৎপাদন সক্ষমতার (প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট) ৩+ প্রজন্মের উন্নত VVER-1200 থার্মাল নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরভিত্তিক কেন্দ্র। ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই মেগা প্রকল্পে ৯০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় ঋণ সরবরাহ করছে রাশিয়া। পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে গেলে তা বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কার্বন নির্গমন কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনবে।

সেই প্রত্যাশা নিয়েই চলতি মাসের শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, পারমাণবিক চুল্লির পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ নামে একটি যন্ত্রে সমস্যা দেখা দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, রূপপুরে ভালভের এই জটিলতার বিষয়টি ছিল অপ্রত্যাশিত। এটাকে বলা হয় পিওআরভি (PORV) ভালভ। এইটা প্রবলেমটা করছে এবং তাদের বিজ্ঞানী ও রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা তা সমাধানের চেষ্টা করছেন।

এরপর ইউরেনিয়াম সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার ঘটনায় রোসাটম বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং এটি ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। চুক্তির শর্তাবলী ও প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী এই জ্বালানি বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের মাধ্যমে পরিবহন করা হবে বলেও জানানো হয়। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে যে চালানটি আসার কথা ছিল, তা এখন অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েক ধাপে আসবে।

এই বিলম্বের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছিলো যখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এলএনজি আমদানি কমে যাওয়া এবং বকেয়া বিলের কারণে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে। সরকার আশা করছিল, রূপপুর থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে এই সংকট অনেকটাই কমবে ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। কিন্তু প্রথম ইউনিটের ভালভ জটিলতা ও দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি আসতে দেরি হওয়ায়, পুরো বিষয়টি নিয়েই উদ্বেগ বাড়লো। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি অক্টোবর-ডিসেম্বরে এলে এবং সব পরীক্ষা সফল হলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝির আগে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হবে না। তবে যে কারিগরি জটিলতাগুলো দেখা দিয়েছিলো তা একে কাটকে শুরু করায় আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন প্রকল্পবাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা।

 //ডিবিটেক/ডিএফআরএন/এসএমপি/আইএইচ//