টেলিকম নীতিতে বড় রূপান্তর, বদলাচ্ছে লাইসেন্সিং কাঠামো
- প্রযুক্তিনিরপেক্ষ লাইসেন্সিংয়ে আসছে নতুন কাঠামো
- স্যাটেলাইট, এমভিএনও ও অবকাঠামো ভাগাভাগিতে নতুন সুযোগ
- পুরোনো নীতি বাতিল করে হবে ধাপে ধাপে রূপান্তর
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে লাইসেন্স, স্পেকট্রাম, অবকাঠামো ভাগাভাগি, আন্তর্জাতিক সংযোগ, স্যাটেলাইট, ক্লাউড, তথ্য সুরক্ষা, ভোক্তা অধিকার ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। ‘টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৬’-এর ভি০.৬ খসড়ায় পুরোনো লাইসেন্সভিত্তিক কাঠামোর পরিবর্তে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ, সেবা ও ঝুঁকিভিত্তিক এবং তথ্য-প্রমাণনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত গেজেটভুক্ত নীতিমালা নয়; গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো লাইসেন্সকে ব্যবসার ধরন নয়, প্রকৃত কার্যক্রম ও ঝুঁকির ভিত্তিতে সাজানো। মূল অনুমোদন কাঠামোয় থাকবে লাইসেন্স, তালিকাভুক্তি, বিজ্ঞপ্তি এবং কোনো খাতভিত্তিক অনুমোদন না থাকার ব্যবস্থা। এর বাইরে নির্দিষ্ট সংবেদনশীল কাজের জন্য আলাদা ‘ফাংশন-স্পেসিফিক অথরাইজেশন’ যুক্ত হবে। ফলে কম ঝুঁকির সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন, কলসেন্টার, বিপিও, হোস্টিং বা এন্টারপ্রাইজ সেবাকে অপ্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক লাইসেন্সের আওতায় আনার সুযোগ কমবে।
পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন লাইসেন্স বিন্যাস
২০২৫ সালের নীতিমালায় যে বিস্তৃত কাঠামো চালু হয়েছিল, নতুন খসড়ায় সেটিকে আরও সূক্ষ্মভাবে ভাগ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নীতিমালাটি ১৮ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত হয়ে ২২ সেপ্টেম্বর গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল। একই সময়ে ২০১০ সালের আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা নীতিমালা বাতিল করা হয়।
২০২৬ খসড়ায় ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার বা এনআইসিএসপি কাঠামোর পরিবর্তে টাওয়ার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার বা টিসিএসপি আনা হয়েছে। টিসিএসপির আওতায় ট্রান্সমিশন ও ফাইবার, টাওয়ার ও নিউট্রাল-হোস্ট এবং এক্সচেঞ্জ ও ইন্টারকানেক্ট—এ ধরনের আলাদা অনুমোদন বা এনডোর্সমেন্ট রাখার সুযোগ থাকবে।
অন্যদিকে মোবাইল ও আইএসপি খাতকে একই ‘অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক’ বর্ণনার মধ্যে রাখলেও এএনএসপি নিজে কোনো লাইসেন্স বা আলাদা প্রতিষ্ঠান হবে না। মোবাইল সেবার জন্য থাকবে সেলুলার মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার বা সিএমএসপি লাইসেন্স এবং ইন্টারনেট সেবায় থাকবে দেশব্যাপী ও জেলা পর্যায়ের আইএসপি লাইসেন্স। জেলা আইএসপির ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রবেশের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
নতুন সংযোজন: ঝুঁকিভিত্তিক টেলিকম সেবা
নীতির নতুন গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো টেলিকম-এনেবলড সার্ভিস প্রোভাইডার বা টিইএসপি কাঠামো। সফটওয়্যার, অ্যাপ, কলসেন্টার, বিপিও, হোস্টিং, এন্টারপ্রাইজ সেবা, এসএমএস অ্যাগ্রিগেশন, যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম, যানবাহন সংযোগ, ব্যবস্থাপিত আইওটি ইত্যাদিকে তাদের প্রকৃত ঝুঁকি অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে রাখা হবে। কিছু সেবার ক্ষেত্রে কোনো খাতভিত্তিক অনুমোদনই প্রয়োজন হবে না।
এর ফলে টেলিকম খাতে ‘এক সেবা—এক লাইসেন্স’ ধরনের পুরোনো ধারণা থেকে সরে গিয়ে ‘কাজ ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এমভিএনও, নেটওয়ার্ক শেয়ারিং ও নতুন ব্যবসার সুযোগ
খসড়ায় মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর বা এমভিএনও-কে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। এমভিএনও নিজস্ব রেডিও নেটওয়ার্ক বা স্পেকট্রাম নিয়ন্ত্রণ করবে না; হোস্ট সিএমএসপির নেটওয়ার্ক ও স্পেকট্রাম ব্যবহার করে সেবা দেবে। গ্রাহক, বিলিং, তথ্য সুরক্ষা, সেবার মান, রাজস্ব ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার জন্য আলাদা কাঠামো থাকবে।
এছাড়া ব্যক্তিগত, শিল্প ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নেটওয়ার্ক, নেটওয়ার্ক স্লাইসিং, স্পেকট্রাম ভাগাভাগি, সক্রিয় রেডিও অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক ও কোর নেটওয়ার্ক শেয়ারিংয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে—তবে ঝুঁকি থাকলে নির্দিষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন
নতুন খসড়ায় স্পেকট্রামকে স্পষ্টভাবে দুর্লভ জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। স্পেকট্রাম বরাদ্দকে লাইসেন্স থেকে আলাদা অধিকার হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং প্রতিটি বরাদ্দে ব্যান্ড, ভৌগোলিক এলাকা, মেয়াদ, ব্যবহারাধিকার, ফি, রোলআউট, হস্তক্ষেপ, শেয়ারিং, লিজিং বা ট্রেডিং, রিফার্মিং, নবায়ন ও সমর্পণের নিয়ম উল্লেখ করার প্রস্তাব রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিটিআরসিকে স্পেকট্রামের রোডম্যাপ এবং অব্যবহৃত নয় এমন তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবহার নিরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। রিফার্মিং, সেকেন্ডারি ব্যবহার, শেয়ারিং ও স্পেকট্রাম পুনরুদ্ধারেও আনুপাতিক ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
এটি সাম্প্রতিক টেলিকম খাতের আলোচনায় উঠে আসা স্পেকট্রামের ফ্লোর প্রাইজ, অবিক্রীত তরঙ্গ, অপারেটরের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও জাতীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তরঙ্গের দাম নির্ধারণে নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগ
খসড়ায় কোনো ফি, চার্জ, রাজস্ব ভাগ, স্পেকট্রাম মূল্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে অবদান বা সরকারি পাওনা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রাজস্ব নয়—নিয়ন্ত্রক ব্যয়, স্পেকট্রামের দুষ্প্রাপ্যতা, বাজার কাঠামো, বিনিয়োগ, গ্রাহকের সামর্থ্য, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য, রাজস্ব প্রভাব ও প্রশাসনিক সরলতা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এটি স্পেকট্রাম মূল্য নিয়ে সাম্প্রতিক শিল্পখাতের ‘ঐতিহাসিক দাম নয়, বর্তমান প্রযুক্তি ও বাজার বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন’ দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যানের গবেষণাভিত্তিক নীতি ও ‘সুইট পয়েন্ট’ খোঁজার বক্তব্যের সঙ্গে এ কাঠামোর নীতিগত মিল রয়েছে।
অবকাঠামো ভাগাভাগিতে নতুন ব্যবস্থা
টাওয়ার, ফাইবার, ডাক্ট, খুঁটি, ব্যাকহল, কলোকেশন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত ও বৈষম্যহীন শর্ত বা এফআরএএনডি নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। টিসিএসপিকে নির্দিষ্ট পণ্য, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, সেবার মান, ধারণক্ষমতা, পুনরুদ্ধার ও বিরোধ নিষ্পত্তির তথ্যসহ রেফারেন্স অফার প্রকাশ বা জমা দিতে হবে।
আরও বড় পরিবর্তন হলো ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিঙ্গেল উইন্ডো। সড়ক কাটিং, সরকারি জমি, ইউটিলিটি ক্রসিং, টাওয়ার স্থাপন, পরিবেশগত অনুমোদন ও পুনঃস্থাপন—এসব অনুমোদনকে সমন্বিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন সড়ক, রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ করিডর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য জায়গা, ডাক্ট ও বিদ্যুৎ সুবিধা রাখার কথাও বলা হয়েছে।
স্যাটেলাইট থেকে ডাইরেক্ট-টু-ডিভাইস
নন-টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও বড় পরিসর তৈরি করা হয়েছে। নতুন এনটিএনএসপি লাইসেন্সের আওতায় জিওস্টেশনারি ও নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট, স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড, ব্যাকহল, ভিএসএটি, আর্থ স্টেশন, সামুদ্রিক ও বিমান যোগাযোগ, মোবিলিটি টার্মিনাল এবং ডাইরেক্ট-টু-ডিভাইস সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলালিংকসহ অপারেটরদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নিয়ে সাম্প্রতিক আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এই কাঠামো বাজারে নতুন প্রযুক্তির প্রবেশকে আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারে।
ক্লাউড, সিডিএন, এজ ও এআই অবকাঠামোয় প্রণোদনা
খসড়ায় ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, কলোকেশন, কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, এজ ও সার্বভৌম কম্পিউটিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এআই-উপযোগী ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস, এজ অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবার স্থানীয় হোস্টিং উৎসাহিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিটিআরসিকে আইওটি, প্রাইভেট নেটওয়ার্ক, নেটওয়ার্ক-অ্যাজ-এ-সার্ভিস, এআই-সহায়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা এবং কোয়ান্টাম-নিরাপদ যোগাযোগ নিয়ে সীমিত সময়ের স্যান্ডবক্স বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল
নীতিতে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল বা এসওএফ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। অবহেলিত এলাকার মানচিত্র, স্বচ্ছ নির্বাচন, ধাপভিত্তিক অর্থ ছাড়, প্রয়োজন অনুযায়ী উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার, স্বাধীন যাচাই এবং জনসম্মুখে ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে তহবিল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। গ্রাম, উপকূল, চর, হাওর, পাহাড়, সীমান্ত ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল এবং প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিগত নির্দেশনা রয়েছে।
এটি প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সাম্প্রতিক কমদামি ডিভাইস, ফিচার ফোন, কিস্তি সুবিধা এবং এসওএফ ব্যবহার করে শেষ পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত করার বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গ্রাহক সুরক্ষায় বাধ্যবাধকতা
নতুন নীতিতে সেবা চালুর আগে গ্রাহককে ট্যারিফ, কর, গতি, ব্যবহারসীমা, চুক্তির মেয়াদ, ডিভাইস বা ইনস্টলেশন খরচ, নবায়ন, স্থগিতকরণ, বাতিল, ফেরত, অভিযোগ ও ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
অননুমোদিত সেবা চালু, বিভ্রান্তিকর ‘শূন্য মূল্য’ প্রচারণা, গোপন নবায়ন, অন্যায্য লক-ইন, বৈষম্যমূলক গতি কমানো এবং বৈধভাবে অপারেটর পরিবর্তন বা নম্বর পোর্টেবিলিটিতে বাধা দেওয়াকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
বিটিআরসিকে সেবার মানের প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড চালু করতে বলা হয়েছে, যেখানে অপারেটর, অঞ্চল, প্রযুক্তি ও সেবার স্তর অনুযায়ী তুলনা করা যাবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষায় নতুন ভারসাম্য
খসড়ায় সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম রেকর্ড ও আইনসম্মত আড়িপাতার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাকে আলাদা দায়িত্বের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম ব্যবস্থায় সম্পদ তালিকা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, এনক্রিপশন, দুর্বলতা পরীক্ষা, সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপত্তা ও ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার কথা রয়েছে।
বিশেষভাবে বলা হয়েছে, নীতিমালা নিজে কোনো নতুন যোগাযোগে আড়িপাতার ক্ষমতা সৃষ্টি করবে না। বৈধ আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া যোগাযোগে প্রবেশ বা আড়িপাতা যাবে না। নিয়ন্ত্রক পর্যবেক্ষণও প্রয়োজনসীমিত মেটাডেটা বা সমষ্টিগত তথ্যের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ ইতোমধ্যে ১০ এপ্রিল আইন হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে—ফলে নতুন টেলিকম কাঠামোর তথ্য-সুরক্ষা বিধানকে বর্তমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গেটওয়ে ও পুরোনো লাইসেন্সের বিদায়
নতুন নীতিতে আন্তর্জাতিক সংযোগের জন্য ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার বা আইসিএসপি-কে কেন্দ্রীয় লাইসেন্স কাঠামো করা হয়েছে। সাবমেরিন কেবল ও স্থলভিত্তিক আন্তর্জাতিক কেবলের জন্য আলাদা এনডোর্সমেন্ট থাকবে। আন্তর্জাতিক ট্রাফিক অনুমোদিত স্থানীয় গেটওয়ে বা সমমানের জবাবদিহিমূলক স্যাটেলাইট রুট দিয়ে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
পুরোনো আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স ও এনআইএক্স কাঠামো ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থায় চলে যাবে। তবে কোনো পুরোনো বৈধ সেবা শুধু নতুন লাইসেন্সের নাম এসেছে বলে বন্ধ হয়ে যাবে না। কার্যক্রম, গ্রাহক, চুক্তি, নম্বর, স্পেকট্রাম, সম্পদ, তথ্য, কর্মী, পাওনা ও দায়-দায়িত্বের পূর্ণ তালিকা করে পরীক্ষামূলক ও নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর করতে হবে।
কী বাদ যাচ্ছে, কী প্রতিস্থাপিত হচ্ছে
প্রধান বিয়োজন বা প্রতিস্থাপন—
- এনআইসিএসপি পরিভাষার পরিবর্তে টিসিএসপি।
- এএনএসপি কোনো স্বতন্ত্র লাইসেন্স বা প্রতিষ্ঠান নয়।
- কম ঝুঁকির ডিজিটাল সেবায় পূর্ণ লাইসেন্সের প্রয়োজন কমছে।
- পুরোনো আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স ও এনআইএক্স স্তর ধাপে ধাপে বিলুপ্ত হয়ে নতুন কাঠামোয় যাবে।
- ২০১০ সালের আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার নীতিমালা এবং ২০২৫ সালের টেলিকম নীতিমালা—২০২৬ নীতি কার্যকর হলে—রহিত হবে; তবে বিদ্যমান লাইসেন্সের বৈধতা ও দায়-দায়িত্ব সংরক্ষিত থাকবে।
কী কী নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে
প্রধান সংযোজন—
- ঝুঁকিভিত্তিক টিইএসপি কাঠামো।
- দেশব্যাপী ও জেলা আইএসপি লাইসেন্স।
- টিসিএসপি এনডোর্সমেন্ট ব্যবস্থা।
ফাংশন-স্পেসিফিক অনুমোদন। - এমভিএনও কাঠামো।
- ডাইরেক্ট-টু-ডিভাইসসহ নন-টেরেস্ট্রিয়াল সেবা।
- ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, সিডিএন ও এজ অবকাঠামো।
- এআই ও কোয়ান্টাম-নিরাপদ যোগাযোগের স্যান্ডবক্স।
- ডিজিটাল অবকাঠামো সিঙ্গেল উইন্ডো।
- প্রকাশ্য লাইসেন্স, মালিকানা, সিদ্ধান্ত ও মান-সংক্রান্ত রেজিস্টার।
- সেবার মানের প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড।
- দশ বছরের জাতীয় কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান।
- রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা।
- প্রমাণভিত্তিক স্পেকট্রাম রোডম্যাপ ও ব্যবহার নিরীক্ষা।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও ফলাফল প্রকাশ।
- বিটিআরসির ওপর বাড়ছে জবাবদিহি
নীতির একটি মৌলিক পরিবর্তন হলো—বিটিআরসির সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও প্রকাশ্য, কারণনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক করার প্রস্তাব। গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বা সিদ্ধান্তের আগে প্রভাব মূল্যায়ন এবং অংশীজনের পরামর্শের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগ, সরকারি রাজস্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, সেবার ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন ব্যয় বিবেচনা করতে হবে।
বিটিআরসিকে লাইসেন্স, তালিকাভুক্তি, নির্দিষ্ট অনুমোদন, অপ্রকাশ্য নয় এমন মালিকানা, পরামর্শ প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত, সেবার মান এবং অবকাঠামো প্রাপ্যতার জন্য পাবলিক রেজিস্টার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবায়নের সময়সীমাও নির্ধারিত
নীতিটি কার্যকর হলে ১৫ দিনের মধ্যে স্টিয়ারিং ও রিভিউ কমিটি এবং মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অফিস গঠনের কথা বলা হয়েছে। ৪৫ দিনের মধ্যে নীতি ও লাইসেন্সের মধ্যে ফাঁক বিশ্লেষণ, ৯০ দিনের মধ্যে প্রধান কাঠামোগুলোর অনুমোদন এবং ছয় মাসের মধ্যে নতুন লাইসেন্স গাইডলাইন, নির্দিষ্ট অনুমোদন, পাবলিক রেজিস্টার, মান-ড্যাশবোর্ড ও অবকাঠামো পোর্টাল চালুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
জাতীয় কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান, রাষ্ট্রীয় টেলিকম সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংযোগ কর্মসূচি এবং খাতভিত্তিক দক্ষতা পরিকল্পনাও ছয় মাসের মধ্যে তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়ন
প্রস্তাবিত ২০২৬ নীতির মূল দর্শন হলো লাইসেন্সকেন্দ্রিক টেলিকম নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্যক্রম, ঝুঁকি, প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগ, গ্রাহক ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণে যাওয়া। এর ফলে একদিকে পুরোনো বহুস্তরীয় লাইসেন্স কাঠামো সংকুচিত ও পুনর্বিন্যস্ত হবে, অন্যদিকে স্যাটেলাইট, এমভিএনও, এআই, ক্লাউড, সিডিএন, এজ, আইওটি, প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ও নতুন ডিজিটাল ব্যবসার জন্য প্রবেশপথ তৈরি হবে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত গেজেটের ভাষা, স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণের বাস্তব পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়, বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং বিটিআরসির স্বাধীন ও তথ্য-প্রমাণনির্ভর প্রয়োগের ওপর। কারণ খসড়াটিতে কাঠামোগত সংস্কারের বিস্তারিত রূপরেখা থাকলেও স্পেকট্রামের নির্দিষ্ট ফ্লোর প্রাইস বা নতুন মূল্যায়ন সূত্র এখানে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি; বরং একটি আলাদা সরকারি অনুমোদিত স্পেকট্রাম কাঠামোর মাধ্যমে তা নির্ধারণের পথ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু লাইসেন্স কমানো নয়; বরং পুরো টেলিকম ইকোসিস্টেমকে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক, বিনিয়োগবান্ধব, গ্রাহককেন্দ্রিক এবং পরিমাপযোগ্য জবাবদিহির কাঠামোয় নেওয়ার চেষ্টা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই//





