আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সহায়তা করবে অ্যামচেম
ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সাইবার নিরাপত্তায় জোর
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনতে সহায়ক ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। একই সঙ্গে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও আর্থিক খাতের আধুনিকায়নে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। এ সময় প্রতিনিধিদল এসব প্রস্তাব ও অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে।
সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
অ্যামচেম সভাপতির পাশাপাশি প্রতিনিধিদলে ছিলেন অ্যামচেমের সহসভাপতি ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমদ; অ্যামচেমের কোষাধ্যক্ষ ও ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা উর রহমান মাহমুদ; অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া; অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ন্যাটকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল আল মামুন; অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং অ্যাভেরি ডেনিসনের বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন; অ্যামচেমের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শপআপ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহিম চৌধুরী; এবং অ্যামচেমের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী কায়সার মোহাম্মদ রিয়াদ।
বৈঠকে অ্যামচেম জানায়, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং স্বচ্ছ, স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে সংগঠনটি কাজ করে আসছে। অ্যামচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে দেশের কর রাজস্বে ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে বলেও জানানো হয়।
সংগঠনটি জানায়, গত কয়েক বছরে এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বিদ্যমান সদস্য প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী সম্ভাব্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আরও ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনতে সহায়ক ভূমিকা পালনে অ্যামচেম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও সরকারের অংশীদারিত্বও কামনা করেছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের অগ্রগতির প্রশংসা করে অ্যামচেম। বিশেষ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কার প্যাকেজের আওতায় বিনিয়োগ সহজ করতে নেওয়া বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপকে স্বাগত জানায় সংগঠনটি।
নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানো, মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে অ্যামচেম। একই সঙ্গে অগ্রাধিকার খাতগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয় তারা। সংগঠনটির মতে, এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও এআইয়ে গুরুত্ব
ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে পিডিপিএ ও এনডিজিএ প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে অ্যামচেম। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন, এআই গ্রহণ ও ব্যবহারের প্রস্তুতি, সাইবার নিরাপত্তায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্পষ্টতা এবং প্রযুক্তি খাতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে অ্যামচেম। সংগঠনটির মতে, এই কাঠামো দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
অ্যামচেম এমন একটি বিস্তৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর আওতায় প্রযুক্তি, এআই ও ডিজিটাল উদ্ভাবন, ক্লাউড প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতের আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নে জোর
অ্যামচেম জানায়, আগামী দিনের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বর্তমানে গৃহীত সংস্কারগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো। এ জন্য কর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ এবং আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে একটি ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাডভাইজরি ফোরাম বা টাস্কফোর্স এবং একটি পাবলিক-প্রাইভেট কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে অ্যামচেম। প্রস্তাবিত দুটি প্ল্যাটফর্মে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অ্যামচেমের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এগুলো ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে কাজ করবে।
সরকারের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে শুধু নীতিগত দাবি ও সুপারিশ উত্থাপন নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারের ভূমিকা পালনের প্রস্তুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছে অ্যামচেম। এর আওতায় বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার ভিত্তিতে তথ্য-উপাত্ত ও মতামত প্রদান, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা, যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের সংস্কার কার্যক্রম ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরতে ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতেও কাজ করার কথা জানিয়েছে অ্যামচেম।
প্রধানমন্ত্রীকে ইউএস ট্রেড শোর আমন্ত্রণ
সাক্ষাৎকালে অ্যামচেম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায়।
ফলপ্রসূ এ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী অ্যামচেমের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার।
নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা, দক্ষ প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারের পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে অ্যামচেমের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
//ডিবিটেক/ এসএমআই/এনএএম//





