বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতা

রূপপুরের নিরাপত্তায় ইমামদের সম্পৃক্ত করছে এনপিসিবিএল

  • পাকশী ও সাহাপুরের ইমামদের নিয়ে মতবিনিময় সভা
  • পারমাণবিক নিরাপত্তা, বিকিরণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্ব
  • স্থানীয় জনগণের আস্থা তৈরিতে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা

রূপপুরের নিরাপত্তায় ইমামদের সম্পৃক্ত করছে এনপিসিবিএল
৫ নভেম্বর, ২০২৬ ১৪:৩০  

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে পাবনার পাকশী ও সাহাপুর ইউনিয়নের ইমামদের নিয়ে ‘কমিউনিটি লিডার রাউন্ডটেবিল’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া, কেন্দ্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিকিরণ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ভূমিকা তুলে ধরা হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পাবনা এবং পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্র, ঈশ্বরদীর সহযোগিতায় ঈশ্বরদীর পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্রে এ সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান। সভাপতিত্ব করেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনপিসিবিএলের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিউজজামান। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা গোলাম শাহীনুর ইসলাম এবং প্রকল্পের জনসংযোগ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নিরাপত্তা ও বিকিরণ পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব

সভায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, রূপপুর কেন্দ্রের আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিভিন্ন দিক সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রকল্পটির সম্ভাব্য অবদান, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়েও আলোচনা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মো. জাহেদুল হাসান বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি, একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভূমিকা সম্পর্কে স্থানীয় জনগণের কাছে নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।

জনআস্থা তৈরিতে ইমামদের ভূমিকা

সভাপতির বক্তব্যে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, স্থানীয় জনগণের কাছে ইমামরা শ্রদ্ধাভাজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব। সমাজে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব রয়েছে। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার, প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগে ইমামদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে।

মতবিনিময় পর্বে অংশগ্রহণকারী ইমামরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, কেন্দ্রের নিরাপত্তা, বিকিরণের সম্ভাব্য প্রভাব, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের কল্যাণে প্রকল্পটির ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

আয়োজকদের মতে, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আস্থা বাড়াতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে।

গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পাওয়ার স্টার্ট-আপ কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) অনুমোদনের পর ৩০ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ইউনিটটির বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংক্রান্ত পরীক্ষা শুরু হয়। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে টারবাইন, জেনারেটর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও পরীক্ষা, গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সব পরীক্ষা সন্তোষজনকভাবে শেষ হলে বছরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা করছেন।

রূপপুর কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় অবদান রাখার পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। তবে এর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনার জন্য প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

//ডিবিটেক/এসএএন/এসএমপি/এমভিএনও//