তরঙ্গমূল্য কমানোর দাবি

উচ্চ তরঙ্গমূল্যে বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে

  • বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশে অপারেটরদের আয় কমেছে
  • রাজস্বের ১৫.৭ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে তরঙ্গ ব্যবহারে
  • তরঙ্গমূল্য পুনর্বিবেচনা ও দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ চায় অপারেটররা

উচ্চ তরঙ্গমূল্যে বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে
৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১৩:৩৫  

বিশ্বজুড়ে মোবাইল অপারেটরদের আয় বাড়লেও বাংলাদেশে চার মোবাইল অপারেটরের সম্মিলিত আয় কমছে বলে দাবি করেছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)। সংগঠনটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটরদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশের চার অপারেটরের আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে উচ্চ তরঙ্গমূল্য কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছে অপারেটররা।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীতে এমটব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের প্রতিনিধিরা তরঙ্গের মূল্য, মেয়াদ, বিনিয়োগ সক্ষমতা, নেটওয়ার্কের মান এবং গ্রাহকসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

এমটবের দাবি, গত অর্থবছরে চার অপারেটর সম্মিলিতভাবে সরকারকে রাজস্ব বাবদ ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে, যা তাদের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। সংগঠনটি আরও বলেছে, গত ১৫ বছরে গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল সেবার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে বিপুল ডেটা ব্যবহারের চাহিদা ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রয়োজনের তুলনায় অপারেটরদের আয় বাড়ছে না।

রাজস্বের তুলনায় তরঙ্গ ব্যয় দ্বিগুণ

সংবাদ সম্মেলনে এমটব জানায়, বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরদের রাজস্বের ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ তরঙ্গ ব্যবহারের ব্যয়ে চলে যায়। বৈশ্বিক গড় এ হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্সের ২০২৫ সালের গবেষণাতেও বাংলাদেশের অপারেটরদের রাজস্বের তুলনায় তরঙ্গ ব্যয়ের অনুপাত ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বৈশ্বিক মধ্যক ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যক ১০ দশমিক ৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ এ অনুপাতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উভয় মানের চেয়ে এগিয়ে।

অপারেটরদের আশঙ্কা, তরঙ্গের দাম বেশি থাকলে নতুন তরঙ্গ কেনার পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা তরঙ্গ সমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এতে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

কভারেজ থেকে সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর

রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম বলেন, এখন অপারেটররা শুধু নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। থ্রিজি ও ফোরজিতে সীমাবদ্ধ না থেকে উন্নত সেবা দিতে বিনিয়োগের পরিবেশ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, স্পেকট্রাম বরাদ্দের মেয়াদ ১৫ বছরের পরিবর্তে ২০ বছর করা হলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। এতে অপারেটররা নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করতে পারবেন।

স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে শাহেদ আলম বলেন, বিটিআরসি তাদের গবেষণা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে বর্তমান দাম নির্ধারণ করেছে—এটি অপারেটররা স্বীকার করেন। তবে তাঁদের বক্তব্য, মূল্য নির্ধারণে শুধু প্রতি মেগাহার্টজের দাম বিবেচনা না করে সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য, গ্রাহকসেবার মান, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তার মতে, আঞ্চলিক গড়ের কাছাকাছি পর্যায়ে তরঙ্গমূল্য আনা গেলে অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে। অন্যথায় ভবিষ্যতে ৩ দশমিক ৫ গিগাহার্টজ, ৭০০ মেগাহার্টজসহ নতুন ব্যান্ডের তরঙ্গ কেনায় আগ্রহ কমতে পারে। বর্তমানে অবিক্রীত থাকা কিছু ব্যান্ডও তখন অবিক্রীত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগসেবার জন্যও ভবিষ্যতে তরঙ্গ বরাদ্দের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডেটা ব্যবহার বাড়লেও আয় ও বিনিয়োগে চাপ

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, দেশে ডেটা ব্যবহারের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তাঁর দেওয়া তুলনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রাহকপ্রতি গড় আয় (এআরপিইউ) প্রায় ১ দশমিক ২ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা ২ দশমিক ১৫ ডলার। তাঁর মতে, শুধু প্রতি মেগাহার্টজের মূল্য বিবেচনা না করে স্পেকট্রামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্য এবং গ্রাহকদের সেবার মান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ ক্রমেই ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তরঙ্গের দাম কমানো গেলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে অপারেটরদের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দক্ষতা বাড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তাইমুর রহমান বলেন, তরঙ্গমূল্য নিয়ে তাড়াহুড়া না করে অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনায় বসা প্রয়োজন। বেশি পরিমাণ তরঙ্গ তুলনামূলক কম দামে বরাদ্দ দেওয়া গেলে অপারেটররা নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে এবং গ্রাহকদের উন্নত মানের ডেটা সেবা দিতে পারবেন।

গ্রাহকপ্রতি ডেটা ব্যবহারে আঞ্চলিক ব্যবধান

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, দেশের অনেক মানুষ এখনো মোবাইল ইন্টারনেটের আওতায় আসেননি। যারা ব্যবহার করছেন, তাঁদের গ্রাহকপ্রতি গড় ডেটা ব্যবহার প্রায় ৭ দশমিক ৭ জিবি। তাঁর দেওয়া তুলনায় ভারতে এ পরিমাণ ২০ জিবি এবং থাইল্যান্ডে ৩৫ জিবি।

তাঁর মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও বিস্তৃত হলে ইন্টারনেট ব্যবহারের চাহিদা বাড়বে। এ চাহিদা পূরণে অপারেটরদের বিনিয়োগের সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্কের মান বাড়ানো জরুরি।

তানভীর মোহাম্মদ বলেন, দেশের মোবাইল সেবার দাম আন্তর্জাতিক তুলনায় কম হলেও গ্রাহককে আরও ভালো অভিজ্ঞতা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন গ্রাহক ২০০ টাকা ব্যয় করে যদি বেশি কার্যকর সেবা ও সুবিধা পান, তাহলে তাঁর কাছে অর্থের বিনিময়ে প্রাপ্ত সেবার মূল্যও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব গ্রাহকের হাতে এখনো স্মার্টফোন নেই। তাঁর হিসাবে, ৪০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের হাতে স্মার্টফোন নেই। ফলে ভবিষ্যতে ভয়েস থেকে ডেটাভিত্তিক সেবায় রূপান্তরের পাশাপাশি গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তাঁর ভাষ্য, আগে ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড মূলত ভয়েস সেবায় ব্যবহৃত হতো। ডেটার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই ব্যান্ডের একটি অংশ ডেটা সেবায় ব্যবহার করা হচ্ছে। কম ফ্রিকোয়েন্সির ব্যান্ড ঘরের ভেতরে ও দূরবর্তী এলাকায় ভালো কভারেজ দিতে পারে। তাই শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, পুরান ঢাকার মতো ভবনঘন অঞ্চল এবং গ্রামীণ এলাকার জন্য উপযোগী তরঙ্গের সমন্বয় প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তরঙ্গ বরাদ্দের আহ্বান

সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন এমটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার। তিনি বলেন, তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট সময়মূল্য রয়েছে। বর্তমানে ডেটা ব্যবহারের চাহিদা ও নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় অপারেটরদের বড় পরিসরে তরঙ্গ কিনতে হবে। তাই শুধু প্রতি মেগাহার্টজের দাম না দেখে সামগ্রিক সক্ষমতা ও সেবার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের ডেটা চাহিদা ও ফাইভজি প্রযুক্তির বিস্তার বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে তরঙ্গ বরাদ্দ করা উচিত। এক বা দুই বছরের স্বল্পমেয়াদি হিসাবের পরিবর্তে দীর্ঘ সময়ের বিনিয়োগ, রাজস্ব ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তরঙ্গ নবায়ন নিয়ে বিটিআরসির প্রস্তাব

তরঙ্গমূল্য নিয়ে অপারেটরদের আপত্তির প্রেক্ষাপটে বিটিআরসিও নবায়নমূল্য ও বরাদ্দের মেয়াদ পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে। বিটিআরসির প্রস্তাব অনুযায়ী, তিনটি ব্যান্ডে তরঙ্গ নবায়নের মেয়াদ ২০ বছর করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্য ও কিস্তির কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এ প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন।

অপারেটরদের দাবি, তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে শুধু তাৎক্ষণিক সরকারি রাজস্ব বিবেচনা করলে দীর্ঘমেয়াদে নেটওয়ার্ক বিনিয়োগ ও সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁদের মতে, মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে আনা গেলে বেশি তরঙ্গ কেনা, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকদের উন্নত সেবা দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
//ডিবিটেক/আইএইচ /এসএমপি/এমআইএসটি//