‘ডিজিটাল টুইন’ গতি দেবে ‘সিলিকন রিভার’ বাস্তবায়নে

‘ডিজিটাল টুইন’ গতি দেবে ‘সিলিকন রিভার’ বাস্তবায়নে
১০ আগষ্ট, ২০২৬ ০৯:৩৭  
১১ আগষ্ট, ২০২৬ ০০:২৬  

গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের তৈরি পোশাক (RMG) খাত। পোশাক শিল্প একটি কৃষিপ্রধান দেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রফতানিকারকে পরিণত করেছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান মজুরি, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এখন এই খাতের ওপর চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ এখন এমন একটি শিল্পে নজর দিচ্ছে, যা দেখতে শার্টের বোতামের চেয়েও ছোট কিন্তু প্রভাব ও গুরুত্বে বহুগুণ শক্তিশালী—তা হলো ‘সেমিকন্ডাক্টর’ বা মাইক্রোচিপ।

‘সিলিকন রিভার’ ভিশনের ওপর ভর করে ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স, বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে নরোবটিক্স, বৈদ্যুতিক গাড়ি—আধুনিক প্রতিটি শিল্পের মূল ভিত্তি হলো এই সেমিকন্ডাক্টর।

আমাদের ভিত্তি ও সম্ভাবনা
শুধু স্বপ্ন দেখে বৈশ্বিক চিপের বাজারে জায়গা করে নেওয়া যাবে না, তবে আমাদের একটি শক্ত সূচনা পয়েন্ট রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BIDA) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭০০-রও বেশি অভিজ্ঞ চিপ ডিজাইনার রয়েছেন এবং প্রতি বছর কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রায় ২০,০০০ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। এক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে ডিজিটাল টুইন আমাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করতে পারে। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে শিল্পকর্মেও আমাদের প্রকৌশলীরা বিশ্বমঞ্চে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবেন।

আমাদের শুরুতেই শত শত কোটি ডলার খরচ করে বিশাল 'ওয়েফার ফেব্রিকেশন প্ল্যান্ট' বা ফ্যাব্রিকেটর (Fab) তৈরির আগে ডিজিটাল টুইনে মনযোগী হতে হবে। কেননা, সব আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট এর ডিজিটাল টুইন দরকার। কিন্তু এখানে ডিজিটাল টুইন বিষয়ে যেমন শেখানো হয় না; তেমনি শিল্প ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার নেই । তাই সবচেয়ে আগে এটির ব্যবহার প্রয়োজন বোধ করছে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি। তাই ছয় মাসের ট্রেনিং এর মাধ্যমে লাখ লাখ আইটি  প্রফেশনাল দেরকে পিভোট করানো সম্ভব।

একজন ডিজিটাল টুইন এক্সপার্ট বা ইঞ্জিনিয়ারের আয় বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই পেশায় গড় বার্ষিক আয় প্রায় ১৩৯,০০০ থেকে ১৫৮,০০০ মার্কিন ডলার এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিনিয়র পদে তা ১,৮০,০০০ থেকে ২,৮০,০০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, ভারতে বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ রুপি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

অপরদিকে ‘ফ্যাব’ তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন উচ্চ প্রযুক্তির পরিকাঠামো প্রয়োজন। তাই ফ্যাবের আগে আমাদের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো। 

প্রথম ধাপেই ‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহারের গুরুত্ব
বাংলাদেশকে সেমিকন্ডাক্টর খাতের শিল্পায়নের প্রথম ধাপেই গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশন এবং ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা জানার জন্য ডিজিটাল টুইন-এ জোর দিতে হবে।

ডিজিটাল টুইন হলো কোনো বাস্তব পণ্য, যন্ত্র বা পুরো কারখানার একটি জীবন্ত এবং পরিবর্তনশীল ডিজিটাল প্রতিরূপ। এটি বাস্তব ও ডিজিটাল জগতকে একই সুতোয় বেধে ফেলে; ফলে বাস্তবে চিপ বা প্রোটোটাইপ তৈরির আগেই ডিজিটাল মডেলে তা সিমিউলেশন, টেস্ট এবং অপটিমাইজ করা সম্ভব হয়।

ডিজিটাল টুইন ব্যবহারের সরাসরি সুবিধা
ঝুঁকি ও খরচ হ্রাস: বাস্তবে চিপ বানানোর আগেই ডিজিটাল মডেলে পরীক্ষা করা যায় বলে কোটি টাকার শারীরিক প্রোটোটাইপ তৈরির খরচ ও ঝুঁকি বেঁচে যায়।
প্রথমবারেই নিখুঁত ফলাফল: চিপের ত্রুটি বা পারফরম্যান্স আগে থেকেই পূর্বাভাস করা যায়, ফলে পুনর্বার কাজ করার প্রয়োজন কমে।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: সিস্টেমের ডাউনটাইম কমে, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হয় এবং ডিজাইনের সর্বোচ্চ পুনঃব্যবহার (Reuse) নিশ্চিত করা যায়।
ছোট থেকে শুরু করে বড় পরিসরে রূপান্তর: নতুন স্টার্টআপ এবং গবেষকরা ডিজিটাল সিমিউলেশনের মাধ্যমে ছোট স্কেলে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে যেতে পারেন।

বাস্তবায়নযোগ্য অ্যাকশন প্ল্যান
এই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট ৫টি স্তম্ভে কাজ করতে হবে:
১. দক্ষ মানবসম্পদ ও ডিজিটাল অবকাঠামো: ভিএলএসআই (VLSI), মাইক্রোইলেকট্রনিক্স এবং ইডিএ (EDA) কোর্সের আধুনিকায়ন। শিক্ষার্থী ও স্টার্টআপদের জন্য যৌথ উদ্যোগে ‘ডিজিটাল টুইন ও ইডিএ সিমুলেশন ল্যাব’ স্থাপন করা, যাতে তারা ব্যয়বহুল সফ্টওয়্যারগুলো সহজে ব্যবহার করতে পারে।

২. নীতি ও অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা: বাজেটে ঘোষিত কাঁচামাল আমদানিতে ১% ডিউটি এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুবিধা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য মুক্ত করে দ্রুত কার্যকর করা। একইসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ডাটা করিডোর, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং মেধা সম্পদ সুরক্ষা (IP Protection) নিশ্চিত করা।

৩. আঞ্চলিক বাস্তবতা ও নিজস্ব অবস্থান তৈরি: ভারত তাদের সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার (১.৬ লাখ কোটি রুপি) বিনিয়োগ করছে। ভারত বা তাইওয়ানের সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বাংলাদেশের উচিত চিপ ডিজাইন, ডিজিটাল টুইন সিমিউলেশন, ভেরিফিকেশন এবং পরবর্তীতে অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং (ATP) খাতে প্রাধান্য দেওয়া। 

৪. পোস্ট-প্রোডাকশন টেস্টিং, প্যাকেজিং ও গ্রাহক মতামত মূল্যায়ন: চিপ ডিজাইনে দক্ষতা অর্জনের পর ধীরে ধীরে সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং (ATP/OSAT) শিল্পে প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে নিজস্ব অবস্থান বড় করা। এরপর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিংয়ে রূপান্তর করা সম্ভব হয়।
৫. সার্বিক লাইফসাইকেল পর্যবেক্ষণ: বাজারে চিপ ছাড়ার পর ব্যবহারকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং পারফরম্যান্স ডেটা ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে সংগ্রহ করা। সেই তথ্য পুনরায় আরএন্ডডি (R&D) ও পরবর্তী চিপ ডিজাইনে ব্যবহার করে সেমিকন্ডাক্টরের মান নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্নত করা।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবায়নে
এক বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জাতীয় দক্ষতার পরীক্ষা। পোশাক খাত সফল হয়েছিল কারণ আমরা দশকের পর দশক ধরে এর চারপাশে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করেছি। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও ঠিক একই রকম ধৈর্য, নিখুঁত পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা প্রয়োজন।

‘সিলিকন রিভার’ ভিশন অবশ্যই অর্জন যোগ্য। আসল চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক প্রযুক্তির সাপ্লাই চেইনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে আমরা ডিজিটাল-ফার্স্ট এই কঠিন কাজগুলো কতটা দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করছি।


লেখকঃ প্রকাশক, ডিজিবাংলা, সম্পাদক, সারবাংলা, উদ্যোক্তা ও জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি, আইএসপিএবি


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।