অ্যামচ্যামের নীতি সংলাপে উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; চতুর্থ প্রান্তিকে এআই নীতি প্রণয়নের ঘোষণা
টেলিকমে কর কমানোসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারের ৫ অগ্রাধিকার ঘোষণা
- দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ ঘোষণা দিয়ে টেলিকম খাতের কার্যকর কর ৫১-৫৬% থেকে কমানোর ঘোষণা।
- এস্তোনিয়ার আদলে আসছে বিনামূল্যের ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ প্ল্যাটফর্ম
- পোশাক খাতের (RMG) মতো ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা ও ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাবমেরিন ক্যাবল বাড়ানোর তাগিদ
ঢাকা, ৯ আগস্ট, রবিবার: দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বা ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ (Thrust Sector) হিসেবে বিবেচনা করে পাঁচটি বিষয়কে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
অগ্রাধিকারগুলো হলো— টেলিকম খাতে করের বোঝা কমানো, উন্নত মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিশ্চিত করা, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল তৈরি এবং দেশীয় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্প জোরদার করা।
রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় ৯ আগস্ট, রবিবার আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘অ্যাক্সিলারেটিং বাংলাদেশ’স ডিজিটাল ফিউচার: পলিসি প্রায়োরিটিজ ফর ইনোভেশন, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড আইসিটি-লেড গ্রোথ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, আইসিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সরকারের এ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অগ্রাধিকারগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বক্তব্যে টেলিযোগাযোগ খাতে কর কমানো ও পূর্বাভাসযোগ্য নীতি প্রণয়ের ইঙ্গিত দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বজুড়ে টেলিকম খাতে কার্যকর করের হার গড় ২২ থেকে ২৭ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে এই হার ৫১ থেকে ৫৬ শতাংশের মতো অস্বাভাবিক উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এ বৈষম্য দূর করতে পাঁচ বছরের জন্য একটি পূর্বাভাসযোগ্য ও স্থিতিশীল কর কাঠামো তৈরির পাশাপাশি সিম কর প্রত্যাহারের বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগের গুণগত মানোন্নয়নে গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, গ্রাহকসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে অবস্থান করলেও সেবার মানের দিক থেকে দেশটি এখনও পিছিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (ITU) গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হলে জাতীয় জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই প্রবৃদ্ধির স্বার্থেই সংযোগের মান বাড়ানো জরুরি।
রেহান সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়ে আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতা ছয় টেরাবাইট, যেখানে সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ১২ টেরাবাইট। তিনি আরও জানান যে প্রতি দুই বছরে ট্র্যাফিকের পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছে এবং নতুন সাবমেরিন কেবল তৈরি করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে।
ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো (DPI) গঠনের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, এস্তোনিয়ার বিশ্বখ্যাত ‘এক্স-রোড’ (X-Road) মডেলের আদলে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় আইডি সরাসরি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত হবে।
এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা ভিত্তিক দক্ষ জনবল গঠনে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দেশে প্রতি বছর ২৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞানে স্নাতক বের হন। তাঁদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সায়েন্সে উচ্চতর দক্ষ করে তোলার ওপর জোর দেন উপদেষ্টা। পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে তার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন. একটি জাতীয় এআই নীতি নিয়ে কাজ চতুর্থ প্রান্তিকে শুরু হবে, যেখানে বেসরকারি খাত, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ দল গঠিত হবে।
এছাড়াও তৈরি পোশাক খাতের (RMG) মতো ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পেও বিশেষ সরকারি প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন রেহান আসিফ আসাদ। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সঠিক নীতিগত সহায়তায় গত এক দশকে দেশটির ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি ১ বিলিয়ন থেকে লাফিয়ে ২১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
জাতীয় এআই নীতি ও সাইবার নিরাপত্তা: সাইবার নিরাপত্তাকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার উল্লেখ করে উপদেষ্টা জানান, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (Q4) বেসরকারি খাত, সরকার, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ টিমের মাধ্যমে ‘জাতীয় এআই নীতি’ প্রণয়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
উপদেষ্টার বক্তব্যে সাবমেরিন ক্যাবল ও ডেটা সার্বভৌমত্ব বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, দেশে ৬ টেরাবাইট সাবমেরিন ক্যাবল সক্ষমতার বিপরীতে সর্বোচ্চ চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে। প্রতি দুই বছরে ডেটা ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে এবং নতুন ক্যাবল বসাতে ২-৩ বছর সময় লাগে। তাই ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিলম্বে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে দেয়া উপস্থানায় প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানালেন আরএফআইডি (RFID) ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা বর্তমানে টেস্ট মোডে চালু রয়েছে। এছাড়া ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের নীতিগত সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মত হয়েছে এবং ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি’ প্ল্যাটফর্ম দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় নেটওয়ার্কের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
নীতি সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যামচ্যাম সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। তিনি সরকারের ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (PDPA)’ অনুমোদন এবং ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর অব্যাহতি ও সেমিকন্ডাক্টর আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রদানকে স্বাগত জানান।
তবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে অ্যামচ্যামের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়:
ডিজিটাল স্থায়ী প্রতিষ্ঠান (Digital Permanent Establishment): নতুন ট্যাক্স বিধানে ১ লাখ গ্রাহকের যে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতার দাবি করা হয়।
আইএসপির টার্নওভার কর: ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (ISP) মোট আয়ের ওপর টার্নওভার কর ১% থেকে বাড়িয়ে ১.৫% করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক লেনদেন: টেক কোম্পানি ও স্টার্টআপগুলোর জন্য বৈদেশিক অর্থ লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি তোলা হয়।
অ্যামচ্যামের আইসিটি সাবকমিটির চেয়ার এবং ওরাকলের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে সিটিব্যাংক, সিসকো, এইচএসবিসি, মাস্টারকার্ড, মেটলাইফ, পাঠাও, পিডব্লিউসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, শপআপ ও ভিসার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংলাপে মেট্রো ও টোল ব্যবস্থায় ওপেন-লুপ টিকিটিং, স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সে ১৫% ভ্যাট অব্যাহতি এবং জাতীয় ডেটা গভার্নেন্স কর্তৃপক্ষ দ্রুত গঠনের দাবি জানানো হয়।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই//





