ঘাটতি নয়; এখনো অবিক্রিত ৩টিবি ব্যান্ডউইথ
চতুর্থ সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেলক্ষ্যে এরইমধ্যে একটি প্রস্তাবনা সিঙ্গাপুর দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবনাটি নিয়ে এখন সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ঠিক এমন সময়ে দেশে ব্যান্ডউইথের ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতের সাবমেরিন কেবল প্রকল্প ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও বিতর্ক।
এর মধ্যে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব।
তিনি বলেছেন, ‘বেসরকারি সাবমেরিন কেবল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্য, যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, আনট্রাস্টেড কোনো কেবলে যেন বাংলাদেশ না যায়। বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন কোনো কিছু করব না, যেটাতে ভূরাজনৈতিক টেনশন তৈরি হয়। আমার মন্ত্রণালয়ের একটি লাইসেন্সের কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না।’
আর ব্যান্ডউইথের ঘাটতির শঙ্কাটি উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি)-এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমাস হোসেন জানিয়েছেন, সিমিউই ৪ এবং ৫- এই দুটি ক্যাবলের মাধ্যমে বিএসসিপিএলসি’র সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার ২০০ জিবিপিএস। এর মধ্যে চার হাজার ২০০ জিবিপিএস ইতোমধ্যে দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং অতিরিক্ত তিন হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। চাহিদার ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার মাধ্যমে এই সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করাও সম্ভব। এখনো ৩,০০০ জিবিপিএস বা ৩ টেরাবিট ব্যন্ডউইডথ অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
সূত্রমতে, পুঁজিবাজারে তালিকভূক্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির মাধ্যমে দেশে মোট ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫,০০০ জিবিপিএস, গুগল, ফেসবুক এবং অ্যাকামাই-এর মতো কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্কের (CDN) ব্যান্ডউইথ, যা বর্তমানে ভারতের এজ ডাটা সেন্টার থেকে সরবরাহ করা হয়। যদি এই ধরনের এজ ডাটা সেন্টার বাংলাদেশে স্থাপন করা যায়, তাহলে ভারতের উপর নির্ভর করে ব্যান্ডউইথ আমদানির প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশকে বর্তমানে মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা (বা বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা) পরিশোধ করতে যে ব্যয় হচ্ছে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইডথ বা আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি -এর চাহিদা পূরণে বিএসসিপিএলসি সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে জানিয়ে বিএসসিপিএলসি ব্যাবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন বলেন, ব্যন্ডউইডথ ঘাটতির ধুয়া তুলে একটি মহল দেশে untrusted submarine cable এর সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে কোন ধরনের Untrusted সাবমেরিন ক্যাবল সিস্টেমের সাথে সংযুক্তি দেশের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে যা বিভিন্নভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে যাচ্ছে।
সামিট কমিউনিকেশন, মেটাকোর এবং সিডিনেটকে আলাদা সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেয়। পরে ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের জন্য তারা যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এই কনসোর্টিয়ামের চলমান সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের মূল কেবল ‘সিগমার (সিঙ্গাপুর-মায়ানমার)’ নির্মাণ করছে চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক’ (এইচএমএন)। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির ইতিমধ্যেই বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিভিন্ন দেশ রোজরালেঅ আপত্তি জানিয়েছেন বলেও জানান আসলাম হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যান্ডউইথ আমদানির জন্য ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার সামিট কমিউনিকেশন, মেটাকোর এবং সিডিনেটকে আলাদা সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স দেয়। পরে ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জনের জন্য তারা যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ প্রাইভেট কেবল সিস্টেম’ নামে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এই কনসোর্টিয়ামের চলমান সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের মূল ক্যাবল ‘সিগমার (সিঙ্গাপুর-মায়ানমার)’ নির্মাণ করছে চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক’ (এইচএমএন)। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুও এই ক্যাবল। এমন পরিস্থিীততে বেসরকারি খাতের এই সাবমেরিন কেবলের প্রযুক্তিগত কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানকে ‘আনট্রাস্টেড’ উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একাধিকবার অনানুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল একাধিকবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে দেশের সমাজ ও আদালতে পাচার, খুন, ব্যাংক লুট সহ বিভিন্নধরনের অপরাধের অভিযোগ আছে তাদের বিষয়ে কথা বলতে মন্ত্রণালয় বিব্রতবোধ করে। আমরা তাদের আহ্বান করব, বিতর্কিত ক্যাবলে না গিয়ে ট্রাস্টেড কেবলে অংশগ্রহণ করুক। আমি বিশ্বাস করি, কেউ আনসিকিউরড ক্যাবলে যাবে না।’
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক সংগঠন আইএসপিএবি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ১৩,৮৪৩ জিবিপিএস, যার প্রায় ৭০ শতাংশ (১০,০০০ জিবিপিএস) সিডিএন ব্যান্ডউইথ। এ ধরনের এজ ডাটা সেন্টার স্থাপন করলে, দেশের সরকারি মালিকানাধীন সাবমেরিন ক্যাবল সিমিডব্লিউ-৪ ও সিমিডব্লিউ-৫ দ্বারা আগামী বছরের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। এছাড়াও, নির্মাণাধীন সিমিডব্লিউ-৬ এবং পরিকল্পিত চতুর্থ সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং এজ ডাটা সেন্টারের ব্যান্ডউইথ সরবরাহ ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
সূত্রমতে, সরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্প ‘সিমিউই-৬’-এ শুরুর দিকে চীনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সরে যায় বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি। কম খরচের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভরতা ও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১৬ দেশের আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামও হুয়াওয়েকে বাদ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পটি পুরোপুরি হুয়াওয়ের প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সেবা প্রদানে বাধা কিংবা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ দুটি প্রধান উৎস থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সংগ্রহ করে—টেরেস্ট্রিয়াল এবং সাবমেরিন ক্যাবল। বর্তমানে ব্যান্ডউইথ সংগ্রহের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা (ক্যাপ) নেই। তবে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) থেকে আসে। এ বাণিজ্য শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। তবে এই ব্যবস্থা ভেঙ্গে দিয়ে গত বছরের ভারত থেকে আমদানি করা ব্যান্ডউইথের পরিমাণ দেশের মোট চাহিদার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।







