আটক শহিদুল আলমের ইসরাইলি বাধা ভাঙ্গার যাত্রা
গ্রেফতারের ছবি এআই; সচল ফেসবুক পেজ; ভিডিও বার্তা প্রি-রেকর্ডেড
খ্যাতিমান বাংলাদেশি আলোকচিত্রী ও অধিকারকর্মী ড. শহিদুল আলম গাজামুখী নৌবহরে যোগ দিয়ে জানিয়েছিলেন, এই যাত্রায় প্রধান উদ্দেশ্য মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং অবরোধ ভাঙা। তবে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই সফরে ৮ আগস্ট বন্দি হয়েছেন তিনি। ভূমধ্যসাগরে গাজা উপকূলীয় রেড জোনে কনশানস নৌযান থেকে সকল সহযাত্রীসহ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ফেসবুকে নানা পোস্ট দিচ্ছিলেন। আটকের পর তার প্রশাসকদের মধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পেজটি। এই পেজেই এ ধরনের অপরহরণকে আরেকটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে মন্তব্য করেছে গাজায় ইসলায়েলি অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে ফ্লোটিলা যাত্রা করা ৫০০ জন অধিকারকর্মীর নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’।
এদিকে শহিদুল আলমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অপহরণের খবরের সঙ্গে কোনো ছবি প্রকাশ না করা হলেও নেটদুনিয়ায় তাকে গ্রেফতারের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফ্যাক্টচেক বলছে, ঘটনা সত্য হলেও ছবিটি কিত্রিম। চারজন জায়নিস্ট সেনার হাতে আটক শহীদুল আলমের ছড়িয়ে পড়া ছবিটি বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, প্রথমে ছবিটা দেখে অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম এটা হয়তো আসল। কারণ এখনকার জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একক ছবি দেখে বাস্তব আর কৃত্রিম আলাদা করা কঠিন। তবে পরে একই ব্যাকগ্রাউন্ডে তৈরি একাধিক সংস্করণ দেখা যায়—যেখানে সৈনিকদের অবস্থান, আলো, ছায়া, এমনকি পেছনের সমুদ্র পর্যন্ত হুবহু একই, শুধু সামনের ব্যক্তির মুখ ও পোশাক পরিবর্তন করা। এই মিল থেকেই স্পষ্ট হয় ছবিগুলো আসলে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। তাই আগের মন্তব্য ছিল সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে, আর এখনকার বিশ্লেষণ হলো পূর্ণ প্রমাণসহ—ছবিটি বাস্তব নয়, এটি একটি বিভ্রান্তিকর ভিজ্যুয়াল।
অপরদিকে গাজাগামী নৌবহর থেকে আটক শহিদুল আলমের ভিডিও বার্তাটি প্রি-রেকর্ডেড, মোটেও সাজানো নয় বলে জানিয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট। তবে তার আগেই ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার সাবেক উপ-প্রেস সচিব মো. আশরাফুল আলম খোকন ভিডিওটির একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তোলেন, আটক করা হলে শহিদুল আলম কীভাবে ভিডিও রেকর্ড করে পোস্ট দিলেন? একই ধরনের মন্তব্য আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ একাধিক ফেসবুক পেজ থেকেও ছড়ানো হচ্ছে।
বাংলাফ্যাক্ট অনুসন্ধান টিম জানায়, কনশানস জাহাজের যাত্রীরা যে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন, তা আলজাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, বিবিসি ও টাইমস অব ইসরাইল-এর প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ উভয়পক্ষ থেকেই এই আটকের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
আলোচিত ভিডিওতে শহিদুল আলমকে বলতে শোনা যায়, “যদি আপনারা এই ভিডিওটি দেখে থাকেন...”। স্পষ্টত এটি আগে থেকে রেকর্ডিং করা ভিডিও। ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া যাত্রীরা এমন ভিডিও আগে থেকেই প্রস্তুত রাখেন, যাতে আটক হওয়ার পর সেগুলো প্রকাশ করা যায়। চলতি বছরের জুনে Freedom Flotilla Coalition–Gi ‘Madleen’ জাহাজে অংশ নেওয়া কর্মীরা আটক হওয়ার পর তাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকেও অনুরূপ প্রি-রেকর্ডেড ভিডিও বার্তা প্রকাশ হয়েছিল।
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, আলোচিত ভিডিওটি পোস্ট করার প্রায় দুই ঘণ্টা পূর্বে শহীদুল আলম Israelis approaching conscience লিখে ১মিনিট ১৫ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। ইসরাইলি বাহিনী যে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল, এই ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিলেন। শহিদুল আলমের ফেসবুক পেজে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে, তিনি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তার ফেসবুক পেজটি Bangladesh Stands With Palestine এবং Free Shahidul অ্যাক্টিভিস্টরা পরিচালনা করবেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়ন ও দমননীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার থাকায় শহিদুল আলমকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট।



