প্রকৃতি বাঁচাতে প্লাবনের নিরন্তর লড়াই

ঢাকা: ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গুলশান-বনানী লেকের পাশের পথ প্রায় নিস্তব্ধ। শুক্রবারের সকালে অধিকাংশ মানুষ যখন একটু বেশি ঘুম কিংবা অবসর উপভোগ করেন, তখন ছোট্ট একটি চারাগাছ হাতে ভেজা মাটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন। মাটি খুঁড়ে চারা রোপণ করেন, গোড়ায় পানি দেন। এরপর কাঁধে তুলে নেন ক্যামেরা। কারণ, কিছুক্ষণ […] The post প্রকৃতি বাঁচাতে প্লাবনের নিরন্তর লড়াই first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

প্রকৃতি বাঁচাতে প্লাবনের নিরন্তর লড়াই
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০০  

ঢাকা: ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গুলশান-বনানী লেকের পাশের পথ প্রায় নিস্তব্ধ। শুক্রবারের সকালে অধিকাংশ মানুষ যখন একটু বেশি ঘুম কিংবা অবসর উপভোগ করেন, তখন ছোট্ট একটি চারাগাছ হাতে ভেজা মাটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন। মাটি খুঁড়ে চারা রোপণ করেন, গোড়ায় পানি দেন। এরপর কাঁধে তুলে নেন ক্যামেরা। কারণ, কিছুক্ষণ পরই হয়তো ছুটতে হবে কোনো ঘটনাস্থলে—যেখানে ঘটছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা।

প্লাবন পেশায় ফটোসাংবাদিক। কিন্তু এই পরিচয় তার পুরো জীবনকে ধারণ করে না। ক্যামেরায় তিনি যেমন সময় ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধরে রাখেন, তেমনি ক্যামেরার বাইরে মানুষের পাশে দাঁড়ান, গাছ লাগান, পরিবেশ রক্ষায় কাজ করেন এবং বিপদে পড়া প্রাণী উদ্ধারে অংশ নেন। তার কাছে ক্যামেরা জীবিকার মাধ্যম, আর মানবিকতা ও প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা জীবনের দর্শন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্লাবনের ছবি

ফটোসাংবাদিকতা শুধু ছবি তোলার কাজ নয়; এটি সময়, সমাজ ও ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে রাখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি ছবিতে কখনো ধরা পড়ে মানুষের বেদনা, কখনো প্রতিবাদ, কখনো বিজয় কিংবা ইতিহাসের বাঁকবদল। সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধারণ করে চলেছেন প্লাবন।

তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। করোনা মহামারি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের রাজনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দীর্ঘ সময় ধরে তার ক্যামেরায় নথিবদ্ধ হয়েছে। তার তোলা ছবি দেশ-বিদেশের শতাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছর বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম-এ প্রকাশিত হয়েছে তারেক রহমানকে নিয়ে তার তোলা একটি আলোকচিত্র। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাও তার ক্যামেরায় উঠে এসেছে। এই দুই ঘটনার ছবি বিশ্বের শতাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

মহামারিতে মানুষের পাশে

২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যখন পৃথিবী বিপর্যস্ত, মানুষ ঘরবন্দি এবং হাসপাতালগুলোয় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা, তখন নিজের জন্মস্থান বগুড়ার ধুনট উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন প্লাবন। করোনা আক্রান্ত রোগী উদ্ধার, অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া, আক্রান্ত পরিবারের জন্য খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ, জীবাণুনাশক স্প্রে, মাস্ক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। লকডাউন বাস্তবায়নে প্রশাসনকেও সহযোগিতা করেন।

তার স্বেচ্ছাসেবী জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল করোনায় মারা যাওয়া মানুষের শেষযাত্রায় পাশে দাঁড়ানো। সংক্রমণের ভয়ে যখন অনেক পরিবারই প্রিয়জনের মরদেহের কাছে যেতে পারছিল না, তখন তিনি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মরদেহ দাফনে অংশ নেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তির সৎকারেও সহযোগিতা করেন।

অসহায় মানুষের পাশে প্লাবন

করোনা মহামারি শেষ হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ থামেনি প্লাবনের। ধুনট উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে ‘স্বপ্নসেবা’ সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। ঈদে নতুন পোশাক ও নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি করতে গরু-ছাগল বিতরণের মতো উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন।

ধুনটবাসী কল্যাণ সংস্থার সদস্য হিসেবেও বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। রক্তদান কর্মসূচি, অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তার অংশগ্রহণ। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি অসহায় মানুষের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেন।

এক দশকের বৃক্ষরোপণ

প্লাবনের কাজের আরেকটি বড় ক্ষেত্র পরিবেশ ও জলবায়ু। এ নিয়ে শুধু কথা বলার পরিবর্তে বাস্তব উদ্যোগে বিশ্বাসী তিনি। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হেল্প দ্য নেশন’।

সংগঠন প্রতিষ্ঠার আগেই শুরু হয়েছিল তার ব্যক্তিগত পরিবেশ আন্দোলন। গত এক দশক ধরে তিনি নিজ উদ্যোগে তালবীজ রোপণ করছেন। তার হাতে পুঁতে দেওয়া অনেক বীজ এখন পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি রোপণ করেছেন কয়েক হাজার দেশীয় ফলজ গাছ।

নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষ হিসেবে প্রকৃতির রুদ্ররূপ কাছ থেকে দেখেছেন প্লাবন। দেখেছেন, নদী কীভাবে মানুষের বসতভিটা কেড়ে নেয়, বন্যা কীভাবে জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর পরিবেশচিন্তাকে গভীর করেছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণের প্রতি রয়েছে তার আগ্রহ। তার কাছে সেখানে গাছ লাগানো মানে শুধু সবুজ বাড়ানো নয়, বরং ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতির পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা।

দেশের যেখানেই যান—সংবাদ সংগ্রহে, ব্যক্তিগত সফরে কিংবা স্বেচ্ছাসেবী কাজে—সুযোগ পেলে সঙ্গে রাখেন গাছের চারা বা বীজ। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় উপযুক্ত জায়গা পেলেই সেগুলো রোপণ করেন। সম্প্রতি বিলুপ্তপ্রায় করঞ্জা গাছের পাঁচশ বীজ সংগ্রহ করেছেন তিনি। সেগুলো থেকে চারা উৎপাদনের কাজ চলছে। তাঁর স্বপ্ন, দেশীয় এই গাছ আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

গাছের পাশাপাশি প্রাণির প্রতিও মমতা

পরিবেশ রক্ষায় প্লাবনের কাজ বৃক্ষরোপণেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। আহত কিংবা বিপদে পড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধারের কাজেও নিয়মিত অংশ নেন।

তার কাছে প্রকৃতি একটি পরস্পরনির্ভর ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ, গাছ, নদী ও প্রাণী একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রকৃতি রক্ষার অর্থ শুধু গাছ লাগানো নয়; প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও এর অংশ। ঢাকায় প্রতি শুক্রবার ভোরে ৫৫ কদমতলা সংগঠনের সঙ্গে গুলশান-বনানী লেক এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও দেখা যায় তাকে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলো সংবাদ সংগ্রহের ব্যস্ততায় কাটলেও ছুটির দিনটির একটি অংশ তিনি উৎসর্গ করেন প্রকৃতির জন্য।

মেয়েকে নিয়ে ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’

পরিবেশ নিয়ে প্লাবনের ভাবনায় জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও। তিনি চান, তার সন্তান এমন পৃথিবীতে বড় হোক, যেখানে বাতাস আরও নির্মল, গাছ আরও সবুজ এবং প্রকৃতি আরও নিরাপদ।

এই ভাবনা থেকেই নিজের কন্যার বয়স যখন মাত্র এক মাস, তখন থেকে তাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২০টি গাছ লাগানোর উদ্যোগ শুরু করেন। নাম দেন ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’। এটি তাঁর কাছে প্রতীকী অঙ্গীকার—নিজের সন্তানের জন্য সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একজন বাবার প্রতিশ্রুতি।

ছবির আড়ালে অন্য এক পরিচয়

ফটোসাংবাদিকদের নাম অনেক সময় ছবির চেয়েও ছোট হয়ে থাকে। পাঠকের চোখ প্রথমে পড়ে ছবিতে, পরে ক্যাপশনে লেখা আলোকচিত্রীর নামটিতে। অথচ সেই ছবির পেছনে থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর তাড়না এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। প্লাবনের জীবনেও রয়েছে এমন অসংখ্য মুহূর্ত। তিনি ক্যামেরায় ইতিহাসের সাক্ষ্য ধরে রাখেন, আবার ক্যামেরা নামিয়ে রেখে দাঁড়ান বিপন্ন মানুষের পাশে। কখনো অসহায় মানুষের সহায়তায়, কখনো আহত প্রাণী উদ্ধারে, কখনোবা মাটিতে পুঁতে দেন একটি বীজ। তাই প্লাবনের গল্প কেবল একজন ফটোসাংবাদিকের পেশাগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি মানবিকতা, পরিবেশ সচেতনতা ও নীরব দায়বদ্ধতার গল্প।

The post প্রকৃতি বাঁচাতে প্লাবনের নিরন্তর লড়াই first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.