চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপর্যাপ্ত জেলায়

মেহেরপুরে ফসল আবাদে ডিএপি-টিএসপি সারের সংকট

  • আমন ও সবজির জন্য ৩,৬৫৬ টন চাহিদার বিপরীতে সেপ্টেম্বরের বরাদ্দ মাত্র ২,১৯৭ টন
  • ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ অপেক্ষা করেও চাহিদামতো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন না কৃষকরা
  • সংকট এড়াতে পরিমিত পুষ্টি প্রয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে কৃষি অধিদপ্তর

মেহেরপুরে ফসল আবাদে ডিএপি-টিএসপি সারের সংকট
৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০০  

মাটির উর্বরতা রক্ষা, সুষম উদ্ভিজ্জ পুষ্টি নিশ্চিতকরণ ও টেকসই ফসল উৎপাদনের মৌসুমে দেশের অন্যতম কৃষিনির্ভর অঞ্চল মেহেরপুরে দেখা দিয়েছে ডিএপি ও টিএসপি সারের তীব্র সংকট। চলতি মৌসুমে জমিতে আমন ধানের পরিপক্বতা এবং শীতকালীন সবজির প্রাথমিক রূপান্তরের সময়ে ফসফেটিক পুষ্টি উপাদানের চাহিদা ব্যাপক বাড়লেও সরবরাহ ঘাটতিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, মেহেরপুর জেলায় আমন ধানের পাশাপাশি শীতকালীন আগাম সবজির আবাদ পুরোদমে শুরু হওয়ায় ডায়-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সারের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় কৃষকদের সার সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদার তুলনায় নামমাত্র সার বরাদ্দ পাচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৬ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধান এবং ৪ হাজার ৬৪৭ হেক্টর জমিতে শীতকালীন বিভিন্ন সবজির আবাদ হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক মাত্রায় আমন ধানের জমিতে বিঘাপ্রতি ১৩ কেজি এবং শীতকালীন সবজির জমিতে বিঘাপ্রতি ৩০ কেজি ডিএপি বা টিএসপি প্রয়োগ করতে হয়। এই হিসাবে শুধু আমনের জন্য প্রায় ২ হাজার ৬১৫ মেট্রিক টন এবং শীতকালীন সবজির জন্য প্রায় ১ হাজার ৪১ মেট্রিক টন মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন সারের তাৎক্ষণিক চাহিদা রয়েছে। এর বাইরে সমান্তরালভাবে কলা, পেঁয়াজ, তুলা ও মাষকলাইসহ অন্যান্য ফসলেও ফসফেটিক সারের উচ্চ চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ডিএপি ও টিএসপি মিলিয়ে মোট বরাদ্দ এসেছে মাত্র ২ হাজার ১৯৭ মেট্রিক টন, যা প্রাথমিক আবাদের তুলনায় ঘাটতি তৈরি করেছে।

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে মেহেরপুর সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক জহিরুল ইসলাম জানান, এ মৌসুমে তিনি ৮ বিঘা জমিতে আমন ধান, কলা, করলা, পেঁয়াজ, ফুলকপি ও শসার আবাদ করছেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সার কিনতে গিয়ে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরে মাত্র ৫০ কেজি টিএসপি সার সংগ্রহ করতে সক্ষম হন, যা পরে পেঁয়াজ ও করলার জমিতে ভাগ করে প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “৮ বিঘা জমিতে ৫০ কেজি সার দিয়ে কীভাবে ফসল ফলাব?” ফলে পরবর্তীতে বিকল্প উপায়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে তাঁকে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে। একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান কুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক জামিরুল ইসলাম। ৪ বিঘা জমিতে ফুলকপি ও ১ বিঘা জমিতে মরিচ আবাদ করেও তিনি চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না।

কুতুবপুর ইউনিয়নের সার ডিলার আবদুল আওয়াল জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে সারের যে বাস্তব চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল। আমন ও শীতকালীন সবজির দ্বিমুখী মৌসুম শুরু হওয়ায় সারের যে চালান আসছে, তা ১৫ দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ডিলারদের তথ্যে জানা যায়, বাজারে ইউরিয়া, এমওপি ও সালফেট সারের মজুত স্বাভাবিক থাকলেও ডিএপি ও টিএসপির চাহিদা তুলনামূলক বেশি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে জেলায় ডিএপি ও টিএসপি মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৫৮৯ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মাঠের বাস্তব চাহিদা ও মৃত্তিকা পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘাটতি সামাল দিতে কৃষকদের জমিতে অতিরিক্ত প্রয়োগ পরিহার করে আধুনিক কৃষিতাত্ত্বিক নিয়মে সুষম ও পরিমিত সার ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।

 //ডিবিটেক/ডিএপি/এজিএন/এমএসআই//