চীনা বিশেষজ্ঞদের মাদারগঞ্জ পরিদর্শন

বাংলাদেশে প্রথম এসএমআর কেন্দ্রের উদ্যোগ

  • মাদারগঞ্জের চর এলাকায় সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছে চীনা বিশেষজ্ঞ দল
  • চারটি সম্ভাব্য স্থান দেখেছে বিপিডিবি
  • বিভিন্ন স্থানে ২০০–৩০০ মেগাওয়াটের মডিউলার কেন্দ্রের পরিকল্পনা

বাংলাদেশে প্রথম এসএমআর কেন্দ্রের উদ্যোগ
৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৬  

বাংলাদেশে বড় আকারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি তুলনামূলক ছোট ও মডিউলার পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির সম্ভাবনা যাচাই শুরু হয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) দেখানো সম্ভাব্য চারটি স্থানের একটি জামালপুরের মাদারগঞ্জের চর এলাকায় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিইইসি)-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করেছে।

বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমের বরাত দিয়ে ২ অক্টোবর, শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত মডিউলার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চীনা পক্ষকে মোট চারটি সম্ভাব্য স্থান দেখানো হয়েছে। গত সপ্তাহে তারা জামালপুরের মাদারগঞ্জ পরিদর্শন করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীও পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে বিপিডিবি ইতিমধ্যে সিইইসির সঙ্গে একটি অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট ও মাঝারি আকারের মডিউলার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিপিডিবি চেয়ারম্যান।

কী এই এসএমআর

স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর হলো তুলনামূলক ছোট ক্ষমতার উন্নত পারমাণবিক চুল্লি, যার বিভিন্ন উপাদান ও ব্যবস্থা কারখানায় তৈরি করে মডিউল আকারে স্থাপনস্থলে নেওয়া যায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) সাধারণভাবে প্রতি ইউনিট ৩০০ মেগাওয়াট বৈদ্যুতিক ক্ষমতা পর্যন্ত চুল্লিকে এসএমআর হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। মডিউলার নকশার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো কারখানায় যন্ত্রাংশ তৈরির পর সেগুলো স্থাপনস্থলে নিয়ে সমন্বিতভাবে বসানোর সুযোগ।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় বিভিন্ন স্থানে তুলনামূলক ছোট ক্ষমতার পারমাণবিক মডিউল স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তি নির্বাচন, স্থান উপযোগিতা, নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থনীতি ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ একাধিক ধাপের যাচাই প্রয়োজন হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পরবর্তী ধাপ

বিপিডিবি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্থান ও প্রকল্পের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সবকিছু চূড়ান্ত হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ছোট ও মাঝারি আকারের মডিউলার বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের দিকে এগোবে বাংলাদেশ।

এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রূপপুরের দুই ইউনিটের বাইরে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ছোট আকারের চুল্লি প্রযুক্তি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিও এখন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।

রূপপুরের অগ্রগতি নিয়ে বিপিডিবির অনিশ্চয়তা

এদিকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং অগ্রগতি নিয়ে বিপিডিবি চেয়ারম্যান অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।

রেজাউল করিমের ভাষ্য, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের অগ্রগতি কিংবা দ্বিতীয় ইউনিটের অগ্রগতি সম্পর্কে বিপিডিবির কাছে এখনও পরিষ্কার তথ্য নেই।

রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনার জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য বা শুল্ক এখনও নির্ধারিত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বিপিডিবি রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য হিসেবে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৬ টাকা ৭২ পয়সার একটি প্রাথমিক হিসাব প্রকাশ করেছিল। তবে বিপিডিবি জানিয়েছিল, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তথ্য ও পরিচালন ব্যয় না পাওয়া পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত শুল্ক নয়।

পারমাণবিক শক্তিতে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে রূপপুরের বৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে এই নতুন উদ্যোগ দেশের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মাদারগঞ্জসহ সম্ভাব্য স্থানগুলোতে পরিদর্শন ও অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক এখনো প্রকল্প অনুমোদন বা নির্মাণ শুরুর সমতুল্য নয়। প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও পারমাণবিক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

//ডিবিটেক/বিএনএনএল/এমএনও/বিপিসি//