১৩ টিবিপিএসের হিসাব: 

ব্যান্ডউইথের চাহিদা বনাম ডেটা লোকালাইজেশনের বাস্তবতা

ব্যান্ডউইথের চাহিদা বনাম ডেটা লোকালাইজেশনের বাস্তবতা
১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:২২  

হাইলাইটস:

  • ১৩ টিবিপিএস আন্তর্জাতিক ট্রাফিকের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই মূলত সিডিএন কনটেন্ট (ইউটিউব, মেটা, টিকটক ইত্যাদি)।
  • স্থানীয় সিডিএন ও এজ ডেটা সেন্টার ঘাটতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশের নোড হয়ে আমদানিকৃত ট্রাফিক হিসেবে পরিসংখ্যানে যুক্ত হচ্ছে।
  • ক্যাশড কনটেন্ট বাদ দিলে দেশের প্রকৃত আন-ক্যাশড আন্তর্জাতিক ট্রানজিট চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৪–৫ টিবিপিএস।
  • বিএসসিপিএলসি বর্তমানে দুটি ক্যাবলের মাধ্যমে ৭,২০০ জিবিপিএস সক্ষমতা নিয়ে দেশের ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে।
  • চলমান সি-মি-উই ৬ সাবমেরিন ক্যাবল বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালের মধ্যে বিএসসিপিএলসির ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ৪১,০০০ জিবিপিএসে উন্নীত হবে।

দেশের টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ে আলোচনায় আজকাল একটি সংখ্যা বারবার সামনে আসছে—১৩ থেকে ১৩.৫ টেরাবিট পার সেকেন্ড (Tbps)। বলা হচ্ছে, দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং অচিরেই বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই হিসাবকে সামনে রেখে ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল (ITC) দিয়ে আরও বেশি ব্যান্ডউইথ আমদানি এবং নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।

কিন্তু নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন: এই ১৩ টিবিপিএসের পুরোটা কি সত্যিই বাংলাদেশের ‘গ্লোবাল ইন্টারনেট ট্রানজিট’ চাহিদা?

ডেটার প্রকৃতি এবং এর ভৌগোলিক উৎসের দিকে দৃষ্টি দিলে বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট হয়। মোট ব্যবহারের বড় একটি অংশ মূলত কোনো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট নয়; বরং কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্কের (CDN) মাধ্যমে পৌঁছানো কনটেন্ট। তাই মোট ট্রাফিকের সমষ্টি আর প্রকৃত গ্লোবাল ট্রানজিট চাহিদাকে এক করে দেখলে নীতিনির্ধারণ ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

৬০–৭০ শতাংশ ট্রাফিকের মূলে সিডিএন

আমাদের ইন্টারনেটে সাধারণ মানুষের কনটেন্ট ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক এবং জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর বিপুল কনটেন্ট মূলত সিডিএন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই কনটেন্টের বড় অংশই লাখ লাখ গ্রাহক নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলকভাবে দেখে থাকেন।

উদাহরণস্বরূপ, একই জনপ্রিয় ভিডিও যখন লক্ষাধিক মানুষ দেখেন, তখন প্রতিবারের জন্য সেই ফাইলটি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মূল ডেটা সেন্টার থেকে বারবার বাংলাদেশে টেনে আনার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সিডিএন প্রযুক্তি কনটেন্টটির একটি স্থানীয় অনুলিপি বা ক্যাশ (Cache) ব্যবহারকারীর ভৌগোলিক দূরত্বের কাছাকাছি সংরক্ষণ করে এবং সেখান থেকেই তা সরাসরি সরবরাহ করে।

দেশে পর্যাপ্ত স্থানীয় সিডিএন পরিকাঠামোর ঘাটতি থাকায় বর্তমানে এই কনটেন্টের সিংহভাগ ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের সিডিএন নোড থেকে আইটিসি লিংকের মাধ্যমে দেশে আনা হয়। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢোকার কারণে ট্রাফিক পরিসংখ্যানে এটি ‘আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার’ হিসেবে প্রদর্শিত হয়। কিন্তু সীমান্ত অতিক্রম করা সিডিএন ট্রাফিক আর গ্লোবাল ইন্টারনেটের প্রকৃত ট্রানজিট—কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

এজ ডেটা সেন্টার কেন অপরিহার্য?

ইন্টারনেটের আধুনিক স্থাপত্য এখন কেবল বিশালাকার সেন্ট্রালাইজড ডেটা সেন্টারে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ব্যবহারকারীর যতদূর সম্ভব নিকটবর্তী প্রান্তে ডেটা পৌঁছে দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে ‘এজ ডেটা সেন্টার’ (Edge Data Center) এবং স্থানীয় সিডিএন নোডের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশে যদি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত এজ ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা যায় এবং গুগল, মেটা, আকামাই কিংবা টিকটকের মতো গ্লোবাল টেক প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের নিজস্ব সিডিএন নোড এখানে স্থাপন করে, তবে বর্তমানের এই বিপুল পরিমাণ সীমান্ত-নির্ভর ট্রাফিক দেশের অভ্যন্তরেই ক্যাশিংয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

ঢাকার একজন ব্যবহারকারী যখন ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখবেন, তা যদি ঢাকার স্থানীয় সিডিএন সার্ভারেই সংরক্ষিত থাকে, তবে প্রতিবারের স্ট্রিমিংয়ের জন্য আইটিসি লাইনে বিদেশি ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না; ডেটা সরাসরি লোকাল সার্ভার থেকে আইএসপির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক সংযোগের প্রয়োজন তখনও থাকবে—তবে তা মূলত নতুন কনটেন্ট সিঙ্ক করা, ক্যাশ আপডেট করা এবং প্রকৃত ডাইনামিক গ্লোবাল ট্রানজিট পরিচালনার জন্য; প্রতিটি একক স্ট্রিমিংয়ের জন্য নয়।

আইটিসি কি অপ্রয়োজনীয়?

একেবারেই নয়। আইটিসি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। সাবমেরিন ক্যাবলে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা অতিরিক্ত সক্ষমতার ব্যাকআপ নিশ্চিতে আইটিসি কার্যকর বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করে।

তবে মূল প্রশ্ন হলো—আইটিসি দিয়ে মূলত কী ধরনের ট্রাফিক আসছে এবং এর কতটুকু আমরা দেশের ভেতরেই হোস্ট করতে সক্ষম? স্থানীয় এজ ডেটা সেন্টার পরিকাঠামো শক্তিশালী হলে ভারী সিডিএন কনটেন্টের জন্য সীমান্ত-নির্ভর আমদানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ফলে আইটিসির কার্যকারিতা শেষ হবে না, বরং এর ব্যবহার আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত হবে।

১৩ টিবিপিএস বনাম প্রকৃত আন্তর্জাতিক ট্রানজিট

এখানেই ১৩ টিবিপিএসের কারিগরি মূল্যায়নটি জরুরি হয়ে পড়ে। মোট ব্যবহারের ভেতর থেকে সিডিএন-নির্ভর ক্যাশড কনটেন্টকে পৃথক করলে দেখা যাবে—প্রকৃত আন-ক্যাশড আন্তর্জাতিক ট্রানজিটের চাহিদা এই মোট সংখ্যার তুলনায় অনেকটাই কম।

বিশ্লেষণাত্মক প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকৃত গ্লোবাল ট্রানজিট চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৪ থেকে ৫ টিবিপিএসের কাছাকাছি হতে পারে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে এন্টারপ্রাইজ ক্লাউড সার্ভিস, রিয়েল-টাইম আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ডেটা, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন, ডাইনামিক ওয়েব রিকোয়েস্ট এবং এমন কিছু কনটেন্ট যা স্থানীয়ভাবে ক্যাশ করা সম্ভব নয়। এটি কোনো অপরিবর্তনীয় সংখ্যা নয়; বরং সিডিএন লোকালাইজেশনের সম্ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে একটি প্রযুক্তিগত হিসাব। তাই জাতীয় নীতি প্রণয়নের আগে অপারেটরভিত্তিক ট্রাফিক বণ্টন, সিডিএন ক্যাশিং অনুপাত, পিক-আওয়ার ব্যবহার এবং প্রকৃত আন-ক্যাশড ট্রানজিটের আলাদা তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি।

ক্যাপাসিটি বাড়ানোর সাথে চাই ডেটা লোকালাইজেশন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ডিজিটাল পরিকল্পনা কেবল ‘কত ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন’—এই সরল অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন ডেটা ঠিক কী কারণে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হচ্ছে? যে ডেটা দেশের ভেতরেই রাখা সম্ভব, তা যদি বারবার বিদেশ থেকে আনতে হয়, তবে শুধু ব্যান্ডউইথ আমদানি বাড়ানো কোনো টেকসই কৌশল হতে পারে না।

জাতীয় পরিকল্পনায় দুটি বিষয়কে সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে:

প্রথমত, স্থানীয় এজ ডেটা সেন্টার ও সিডিএন অবকাঠামোর দ্রুত বিকাশ ঘটাতে হবে। এতে লেটেন্সি (Latency) কমবে, সেবার মান বাড়বে এবং ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর ডলারের ব্যয় সাশ্রয় হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরবচ্ছিন্ন গ্লোবাল ট্রানজিট ও জাতীয় রিডান্ড্যান্সির সুরক্ষায় সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে দেশকে আন্তর্জাতিক তথ্য মহাসড়কে যুক্ত রেখেছে। সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও রিডান্ড্যান্সি নিশ্চিতে বিএসসিপিএলসি বর্তমানে ‘সি-মি-উই ৪’ (SEA-ME-WE 4) এবং ‘সি-মি-উই ৫’ (SEA-ME-WE 5)—এই দুটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের অংশীদার; যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বর্তমানে ৭,২০০ জিবিপিএসের (Gbps) অধিক।

২০০৬ সালে দেশে প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই ৪ চালুর সময় মোট আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল মাত্র ১৫০ এমবিপিএস, যা আজ ১৩,০০০ জিবিপিএস (বা ১৩ টিবিপিএস) ছাড়িয়ে গেছে। দেশের এই মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ সরাসরি বিএসসিপিএলসি সরবরাহ করছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ‘সি-মি-উই ৬’ (SEA-ME-WE 6) সংযুক্তির কাজ চলমান রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ সালের মধ্যে বিএসসিপিএলসির একক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১,০০০ জিবিপিএসে পৌঁছাবে।

ভবিষ্যতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব কেবল আন্তর্জাতিক পাইপলাইন বড় করার মধ্যে নয়; বরং সঠিক ডেটা সঠিক ভৌগোলিক সীমানায় সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জাতীয় সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে।


লেখক ||  উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম), বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি), ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।


এডিটরস নোট ||  আলোচ্য নিবন্ধে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার, সিডিএন ট্রাফিকের প্রভাব এবং অবকাঠামোগত বাস্তবতা নিয়ে লেখকের কারিগরি বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিফলিত হয়েছে। টেলিযোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা ও তথ্যভিত্তিক জাতীয় নীতি নির্ধারণের স্বার্থে লেখাটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।



দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।