সিসিটিভি-বডি ক্যামেরায় নকলমুক্ত পরীক্ষা; বাড়ছে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার্থী

এইচএসসি ২০২৬ঃ কমছে কারিগরি-সাধারণের ব্যবধান

এইচএসসি ২০২৬ঃ কমছে কারিগরি-সাধারণের ব্যবধান
২ জুলাই, ২০২৬ ০০:০০  
২ জুলাই, ২০২৬ ০১:০৩  

২ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষা হবে নকলমুক্ত করতে অভূতপূর্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে সরকার। সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বসে যেকোনো কেন্দ্র মনিটরিং করা যাবে।

এ বছর মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। যা গত বছরের চেয়ে ১৯ হাজার ৪৭২ জন বেশি। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার দিকে শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বাড়ছে। সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার অংশ এখন প্রায় ১৯ শতাংশ, যা আগের চেয়ে বেশি।

গত বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন। তার মধ্যে সাধারণ বোর্ডে ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ জন, কারিগরিতে ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১ জন ও মাদ্রাসায় ৮৬ হাজার ১০২ জন। চলতি বছরে সাধারণ বোর্ডে শিক্ষার্থী বেড়েছে ১৪ হাজার ৩১৬ জন, মাদ্রাসায় বেড়েছে ৬ হাজার ৮০৩ জন। তবে কারিগরি বোর্ডে কমেছে ১ হাজার ৬৪৭ জন। কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের সংখ্যা অবশ্য বেড়েছে—২৯ হাজার ৫০৮ থেকে ৩০ হাজার ৪১২ জন।

প্রযুক্তি: নকলের বিরুদ্ধে অস্ত্র

পরীক্ষা সুষ্ঠু করতে যে কয়েকটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে:
প্রযুক্তি উদ্দেশ্য
সিসিটিভি ক্যামেরা (২৬৯৭টি কেন্দ্রে) ২৪ ঘণ্টা কেন্দ্র মনিটরিং
বডি ওর্ন ক্যামেরা (পুলিশের জন্য) বহিরাগতদের প্রবেশ রোধ
মনিটরিং সেল (শিক্ষা মন্ত্রণালয়) দেশের যেকোনো কেন্দ্র থেকে লাইভ মনিটরিং

প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে এবারের পরীক্ষা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুলিশের হাতে থাকছে বডি ক্যামেরা। কেন্দ্রের বাইরে প্রবেশে কঠোর নজরদারি থাকবে। এ ছাড়া ৯টি সাধারণ বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি কমবে।

সরকারের লক্ষ্য—প্রযুক্তিনির্ভর ও নকলমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। এর পাশাপাশি আইসিটি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষায় আইসিটি বাধ্যতামূলক বিষয়। আর বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডে ডিজিটাল প্রশ্নব্যাংক ও মডেল টেস্টের প্রচলন বাড়ছে।

তুলনামূলক চিত্র:
মানদণ্ড সাধারণ শিক্ষা কারিগরি শিক্ষা
২০২৬ শিক্ষার্থী ১০,৬৯,৭১৪ ১,০৭,৯৬৪
প্রতিষ্ঠান ৪,৮৮৫ ১,৮৪৯
কেন্দ্র ১,৬২৬ ৬১০
ফরম পূরণের হার ৬৬.৯৬% ৪৫.৪২%

তবে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি বছরে কারিগরি বোর্ডে কেন্দ্র কমেছে ১২৩টি। অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ২৫টি। আর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফরম পূরণ করেনি ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। যা সাধারণ বোর্ডের ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক।

যদিও বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, তারপরও বড় অংশ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষায় (প্রায় ৮৪.২%)। কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—

  • প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি: কারিগরি বোর্ডে কেন্দ্র কমেছে ১২৩টি, অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ২৫টি। অর্থাৎ বাড়তি প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট পরীক্ষা কেন্দ্র নেই।
  • ফরম পূরণের হার: কারিগরি বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪.৫৮% ফরম পূরণ করেনি, যা সাধারণ বোর্ডে ৩৩.০৪%। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি।
  • শিক্ষার্থী সংখ্যা: সাধারণ বোর্ডে ১০,৬৯,৭১৪ শিক্ষার্থী, যেখানে কারিগরি বোর্ডে ১,০৭,৯৬৪—অর্থাৎ সাধারণের প্রায় ১০ গুণ বেশি শিক্ষার্থী।

তবে ইতিবাচক দিক হলো—মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৬,৮০৩ জন। আর কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে।

পরিসংখ্যান: কারিগরি ও বিজ্ঞানের দিকে ঝোঁক

চলতি বছরের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী। যা গত বছরের তুলনায় ১৯ হাজার ৪৭২ জন বেশি। তবে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা:

সূচক ২০২৫ ২০২৬ তারতম্য
সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ১০,৫৫,৩৯৮ ১০,৬৯,৭১৪ +১৪,৩১৬
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ৮৬,১০২ ৯২,৯০৫ +৬,৮০৩
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ১,০৯,৬১১ ১,০৭,৯৬৪ -১,৬৪৭

কারিগরি বোর্ডে সামগ্রিক শিক্ষার্থী সংখ্যা কিছুটা কমলেও মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে—২৯,৫০৮ থেকে ৩০,৪১২ জন। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রী বাড়লেও ছাত্র কমেছে কিছু কিছু বোর্ডে (যেমন কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে মোট পরীক্ষার্থী কমেছে)।

সবচেয়ে বড় চিত্র—সাধারণ বোর্ডের তুলনায় কারিগরি শিক্ষার সংখ্যা এখনও কম, তবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার মিলিত অংশ ২০২৬ সালে প্রায় ২ লাখ (১,০৭,৯৬৪+৯২,৯০৫) যা সাধারণ বোর্ডের (১০,৬৯,৭১৪) তুলনায় প্রায় ১৮.৮%। এই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমছে।

শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। যদিও সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষার সংখ্যা এখনও অনেক কম, তবে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে। প্রয়োজন আরও কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও জনসচেতনতা।

পরীক্ষা চলবে ২১ দিনে। মোট ৭৭টি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। যে দিন পরীক্ষা নেই, সেদিন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হবে। ভেন্যু কেন্দ্র বাতিল করা হলেও দুর্গম ও পার্বত্য এলাকায় কিছু কেন্দ্র রাখা হয়েছে। সেভেন্থ ডে অ্যাডভান্টিস্ট সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শনিবারের পরীক্ষা সূর্যাস্তের পর নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার নতুন মাত্রা যোগ করছে। তবে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। 

//ডিবিটেক/এসএইচ/এমআই//