গাড়ি নির্মাতারা যেকারণে ‘অ্যান্ড্রয়েড অটো’ বাদ দিচ্ছেন

গাড়ি নির্মাতারা যেকারণে ‘অ্যান্ড্রয়েড অটো’ বাদ দিচ্ছেন
২২ জুন, ২০২৬ ১৯:৫৪  

২০১৫ সাল থেকে গাড়ি নির্মাতা এবং ক্রেতাদের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি যেন চলে আসছিল- গাড়িতে যদি ‘অ্যান্ড্রয়েড অটো’ বা ‘অ্যাপল কারপ্লে’ ব্যবহার করে স্মার্টফোন যুক্ত করার সুবিধা থাকে, তবেই গ্রাহকেরা সেই গাড়ি কিনবেন। গত ১০ বছর ধরে এই সমীকরণটি দারুণভাবে কাজ করেছে। চালকেরা সহজেই গাড়ির স্ক্রিনে নিজেদের ফোনের ম্যাপ, গান বা মেসেজ ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছেন, আর গাড়ি নির্মাতারাও ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম বা ড্যাশবোর্ডের প্রযুক্তি তৈরির ঝক্কি গুগল বা অ্যাপলের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন।

তবে ২০২৬ সালে এসে এই চেনা সমীকরণে বড় ধরনের বদল ঘটতে শুরু করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেনারেল মোটরস (জিএম) ইতিমধ্যেই তাদের নতুন ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি থেকে অ্যান্ড্রয়েড অটো বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নিকট ভবিষ্যতে তাদের সব ধরনের গাড়ি থেকেই এই প্রযুক্তি পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তারা। অ্যান্ড্রয়েড অটোর পরিবর্তে জিএম নিয়ে আসছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, যেখানে ব্যবহার করা হবে গুগলের শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট ‘জেমিনি এআই’।

জেনারেল মোটরস ছাড়াও টেসলা এবং রিভিয়ানের মতো আধুনিক ইভি নির্মাতারা শুরু থেকেই তাদের গাড়িতে অ্যান্ড্রয়েড অটো বা কারপ্লে যুক্ত করার সুবিধা রাখেনি। ২০২৬ সালের অধিকাংশ গাড়িতে এখনো এই প্রযুক্তি থাকলেও, খুব দ্রুতই এই চিত্র বদলে যাওয়ার পেছনে রয়েছে মূল তিনটি কারণ:  

১. ডেটা বা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ
গাড়ি চালানোর সময় চালকেরা কোথায় যাচ্ছেন, কোন পথ ব্যবহার করছেন বা কী কিনছেন—তার বিপুল পরিমাণ জিপিএস এবং ম্যাপ ডেটা সংগ্রহ করে গুগল। এই ডেটা ব্যবহার করে পরবর্তীতে বিজ্ঞাপনদাতারা চালকদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখায়। কিন্তু গাড়ি নির্মাতারা এই মূল্যবান ডেটার কোনো অংশই পায় না। জিএম এবং রিভিয়ানের মতো কোম্পানিগুলোর দাবি, এই ডেটা না পাওয়ার কারণে তারা তাদের গাড়ির পারফরম্যান্স আরও উন্নত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জিএম জানিয়েছে—ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারির চার্জের অবস্থা, রেঞ্জ এবং কাছাকাছি চার্জিং স্টেশনের নিখুঁত রুট ম্যাপ তৈরি করতে গাড়ির নিজস্ব সিস্টেমের কাছে এই ডেটা থাকা অত্যন্ত জরুরি, যা ফোন মিররিং প্রযুক্তির কারণে ফোনের ভেতরেই আটকে থাকে।

২. এআই-চালিত উন্নত ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম
গাড়ি নির্মাতারা এখন আর সাধারণ ফোন স্ক্রিন মিররিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাচ্ছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে তারা গাড়ির ড্যাশবোর্ডেই সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা দিতে চান। যেমন—জেনারেল মোটরস তাদের নিজস্ব সিস্টেমে গুগলের ‘জেমিনি এআই’ যুক্ত করছে। এর ফলে চালকেরা কোনো মুখস্থ কমান্ড ছাড়াই একদম স্বাভাবিক ভাষায় কথা বলে গাড়িকে নির্দেশনা দিতে পারবেন। ইভি চালকেরা খুব সহজে বলতে পারবেন, "আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে অর্ধেক ট্যাংক তেল বা চার্জ লাগবে, এর মধ্যে সবচেয়ে কম খরচের ফুয়েল স্টেশন বা চার্জিং পয়েন্টটি খুঁজে দাও।" এছাড়া গাড়ির নিজস্ব হার্ডওয়্যার শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ ফোন প্রজেকশনের চেয়ে অনেক উন্নত মানের ডলবি অ্যাটমস সাউন্ডের মতো প্রিমিয়াম ফিচার দেওয়া সম্ভব হবে।  

৩. সাবস্ক্রিপশন বা নিয়মিত আয়ের সুযোগ
গাড়ি থেকে অ্যান্ড্রয়েড অটো বাদ দিয়ে নিজস্ব সফটওয়্যার চালুর পেছনে বড় একটি বাণিজ্যিক কারণ হলো ‘সাবস্ক্রিপশন ফি’। গাড়ি নির্মাতারা বুঝতে পেরেছেন যে গাড়ির ভেতরের বিল্ট-ইন অ্যাপ বা প্রিমিয়াম নেভিগেশন সুবিধা ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে বা বছরে একটি নির্দিষ্ট ফি আদায় করা সম্ভব, যা তাদের আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে। যেমন—টেলসা এবং রিভিয়ান ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব প্রিমিয়াম সেলুলার ডেটা ও ম্যাপ সুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে ১৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ফি নিচ্ছে। অ্যান্ড্রয়েড অটো থাকলে যা গ্রাহকেরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজেদের ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করেই পেয়ে যেতেন।  

গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ
গাড়ি নির্মাতাদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিপ্রেমী এবং গাড়ি ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক গ্রাহকই স্পষ্ট জানিয়েছেন, অ্যান্ড্রয়েড অটো বা অ্যাপল কারপ্লে নেই এমন গাড়ি তারা কিনবেন না। একই সাথে গাড়ির সাধারণ ফিচারের জন্য আলাদা করে সাবস্ক্রিপশন বা মাসিক ফি দেওয়ার বিষয়টিকেও অনেকে সহজভাবে নিচ্ছেন না।

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখনো টয়োটা, ফোর্ড, বিএমডব্লিউ বা হুন্দাইয়ের মতো সিংহভাগ ঐতিহ্যবাহী গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ড্রয়েড অটো ও কারপ্লে সমর্থন করে যাচ্ছে। যেহেতু গাড়ি নির্মাতারা ঐতিহাসিকভাবে ভালো বা ব্যবহারকারীবান্ধব সফটওয়্যার তৈরিতে খুব একটা দক্ষ নয়, তাই বাজার ধরে রাখতে অনেক ব্র্যান্ডই এই স্মার্টফোন মিররিং প্রযুক্তি বজায় রাখবে এবং এটি দিন দিন আরও উন্নত ও বুদ্ধিমান হতে থাকবে।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।   সূত্র: এনগ্যাজেট