স্যামসাংকে টপকে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে দামি কোম্পানি ‘এসকে হাইনিক্স’
বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জয়জয়কারের বাজারে এক ঐতিহাসিক ও নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সকে পেছনে ফেলে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এসকে হাইনিক্স’।
আজ সোমবার (২২ জুন) সিউল স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের একপর্যায়ে এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম ৫.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সাধারণ শেয়ারের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কোম্পানিটির মোট মূলধন দাঁড়ায় ২,০৮২.৫ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান উওন (প্রায় ১.৩৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
অন্যদিকে, একই সময়ে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের বাজার মূলধন ছিল ২,০৮১.৩ ট্রিলিয়ন উওন। ২০০০ সালের পর এই প্রথম স্যামসাংকে হটিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান কোরিয়ার শীর্ষস্থান দখল করল। অবশ্য স্যামসাং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের অগ্রাধিকারমূলক বা প্রেফার্ড শেয়ার হিসাব করা হলে তাদের মোট মূল্য দাঁড়াবে ২,২৫২ ট্রিলিয়ন উওন।
দুই দশক আগে ঋণের বোঝায় প্রায় দেউলিয়া হতে বসা একটি কোম্পানির জন্য এই অর্জনকে করপোরেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বা ‘টার্নঅ্যারাউন্ড’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ২০০৩ সালেও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম মাত্র ১৩৫ উওনে নেমে গিয়েছিল, যা কোরিয়ান শেয়ার বাজারে ‘পেনি স্টক’ বা নামমাত্র মূল্যের শেয়ার হিসেবে পরিচিত ছিল।
এসকে হাইনিক্সের এই অভূতপূর্ব উত্থানের মূল চাবিকাঠি হলো ‘হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ বা এইচবিএম চিপ। চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল পরিচালনাকারী এনভিডিয়া ও গুগলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্টদের এআই প্রসেসরের জন্য এইচবিএম চিপ একটি অপরিহার্য উপাদান। প্রথাগত মেমোরি চিপের মন্দা বাজারের সময়ও এসকে হাইনিক্স দূরদর্শিতার সাথে এই বিশেষায়িত চিপ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছিল। এর ফলে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্ব এইচবিএম চিপ বাজারের সর্বোচ্চ ৬১ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় কোম্পানিটি, যেখানে স্যামসাংয়ের অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ।
চলতি বছরেই এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৩৪০ শতাংশ বেড়েছে, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মেমোরি চিপ নির্মাতায় পরিণত করেছে। এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান চে তাই-ওন তাঁর সাম্প্রতিক একটি বইয়ে লিখেছেন, “অতীতে মেমোরি চিপ কার তৈরি—হাইনিক্স, স্যামসাং নাকি মাইক্রোন—তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ সেগুলো সহজেই পরিবর্তনযোগ্য ছিল। কিন্তু এইচবিএম ভিন্ন। এসকে হাইনিক্সের এইচবিএম চিপ অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে পুরো এআই সিস্টেমই হয়তো ঠিকমতো কাজ করবে না।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাজারমূল্যেই নয়, উৎপাদন ক্ষমতার দিক থেকেও স্যামসাংয়ের দীর্ঘদিনের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এসকে হাইনিক্স। ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে তারা তাদের চিপ উৎপাদন প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়াতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে আমেরিকার ‘নাসডাক’ স্টক এক্সচেঞ্জেও তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে এসকে হাইনিক্স, যা বিশ্ব বাজারে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: রয়টার্স





