পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন কলি রানীর
রংপুর: রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের গদাই গ্রামের কলি রানী জন্ম থেকেই দুই হাত অচল। কিন্তু পা-ই তার হাত, শক্তি ও এগিয়ে চলার একমাত্র ভরসা। ডান পা দিয়ে লিখেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। কাউনিয়া মহিলা কলেজের এই শিক্ষার্থীর এখন স্বপ্ন, বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনে যোগ দেওয়া এবং মানুষের সেবা […] The post পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন কলি রানীর first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

রংপুর: রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের গদাই গ্রামের কলি রানী জন্ম থেকেই দুই হাত অচল। কিন্তু পা-ই তার হাত, শক্তি ও এগিয়ে চলার একমাত্র ভরসা। ডান পা দিয়ে লিখেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। কাউনিয়া মহিলা কলেজের এই শিক্ষার্থীর এখন স্বপ্ন, বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনে যোগ দেওয়া এবং মানুষের সেবা করা।
কলির বিশ্বাস, মানুষের সীমাবদ্ধতা শরীরে নয়, মনোবলে। এই বিশ্বাসকে সঙ্গী করেই জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বাবাহীন সংসারের আর্থিক সংকট এবং তিস্তার ভাঙনে জমি হারানোর মতো প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘হার না মানা তরুণী’ হিসেবে।
পরীক্ষায় অসাধারণ অধ্যবসায়
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি সবার সঙ্গে বসে পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয় এবং নিয়মানুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, কলি শুধু লেখাপড়াতেই নয়, সংগীতচর্চা, চিত্রাঙ্কন ও কম্পিউটার শিক্ষার মাধ্যমেও নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন। তার জীবন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কাউনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, ‘পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে জিপিএ ৩.৫০ পেয়েছে কলি। তার এই অর্জনে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত।’
শৈশবেই হারিয়েছেন বাবাকে, সংগ্রামে গড়া জীবন
কলির পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় হারান বাবা কৃষক মনোরঞ্জন রায়কে। ছয় ভাই-বোনের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। সংসারের সবচেয়ে ছোট সন্তান কলিকে নিয়ে মা রূপালী রানীর সংগ্রাম তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে আর্থিক সংকট—দুইয়ের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছেন কলি।
পরিবারের সামান্য কৃষিজমিই তাদের একমাত্র সম্বল। তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে সেই জমিরও বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তবু থামেনি কলির স্বপ্ন দেখা।

পা দিয়ে লিখছেন কলি রাণী।
মা রূপালী রানী বলেন, ‘জন্ম থেকেই মেয়ের দুটি হাত অচল। তাই ছোটোবেলা থেকেই তাকে পা দিয়ে সব কাজ শেখানো হয়েছে। অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কলি নিজের দুই পা-কে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছে। পা দিয়ে সে লেখাপড়া করে, খাওয়া-দাওয়া করে, গোসল করে, চুল আঁচড়ায়, মোবাইল ও কম্পিউটার চালায়। শুধু নিজের পোশাক নিজে পরতে পারে না। ওই কাজটুকু আমি করে দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওর স্বপ্ন বিসিএস পাস করে মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। কৃষিকাজের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে যতটা পারি চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
বড় ভাই মন্টু রায় জানান, ছোটবেলায় ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা শেখা শুরু করেছিল কলি। দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে এখন সে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই দ্রুত লিখতে পারে। তিনি বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে আমাদের অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। এখন যা আছে, তা চাষ করেই কোনোভাবে সংসার চলছে। তারপরও বোনের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব।’
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী
শুধু পড়াশোনায় নয়, ভাওয়াইয়া ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ডজনখানেক পুরস্কার জিতেছেন কলি। পা দিয়ে ছবি এঁকেও পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। পা দিয়েই তিনি অনায়াসে চালান মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার।
স্বপ্ন পূরণে চাই সহযোগিতা
নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কোনোদিন আফসোস করেননি জানিয়ে কলি বলেন, ‘আমার দুই পা-ই আমার হাত, আমার শক্তি। এই পায়ের ওপর ভর করেই আমি সব বাধা অতিক্রম করতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি, আর সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থামব না।’
তবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন কলি ও তার পরিবার। তারা সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেছেন, ‘কলি রানীকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আটকে রাখতে পারেনি। আমরা চাই, তার অদম্য অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায়। তিনি যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন। উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।’
The post পা দিয়ে লিখে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন কলি রানীর first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





