মংলায় ১০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক কেন্দ্র করতে 

বাংলাদেশকে এসএমআর প্রযুক্তিতে চীনের প্রস্তাব

  • মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১০০ মেগাওয়াটের এসএমআর কেন্দ্র প্রস্তাব করেছে চীন
  • উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে
  • বাংলাদেশ প্রথমবার ছোট মডুলার পারমাণবিক প্রযুক্তি বিবেচনা করছে

বাংলাদেশকে এসএমআর প্রযুক্তিতে চীনের প্রস্তাব
৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০০  

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাগেরহাটের মংলা বন্দরের কাছে পরিকল্পিত চীন-বাংলাদেশ মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশে এসএমআর প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রথম প্রকল্প হতে পারে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে বিক্রি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যেই ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এতে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সেফগার্ডস এবং বিস্তাররোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রচলিত বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ছোট ক্ষমতার এবং তুলনামূলকভাবে নমনীয়ভাবে স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নকশা করা হয়। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে। চীনের ১০০ মেগাওয়াট শ্রেণির এসএমআর প্রযুক্তির মধ্যে লিংলং ওয়ান বা এসিপি১০০ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, বাংলাদেশ এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে প্রাথমিকভাবে আগ্রহী এবং কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। তিনি বলেন, “এসএমআর সম্পর্কে আমাদের আরও জানতে হবে। আমরা এতে আগ্রহী। তবে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার পরই সিদ্ধান্ত নেব।”

তবে মংলায় এসএমআর স্থাপনের নির্দিষ্ট চীনা প্রস্তাবটি এখনো তাঁর কাছে পৌঁছায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রী। অর্থাৎ, প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এটি এখনো সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদিত প্রকল্প নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চীনা একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আটজন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশন ওভারসিজ লিমিটেডের আটজন কর্মকর্তা অংশ নেন। চীনের চারজন বিশেষজ্ঞ এসএমআর প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চান।

প্রাথমিক আলোচনায় বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে জমি দেওয়ার বিষয়টিও ছিল বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান। প্রস্তাব অনুযায়ী, কেন্দ্রটির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়ও সরকার বিবেচনা করতে পারে। পাশাপাশি এসএমআর প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরিতে প্রকল্পে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া মংলা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্যও চীনের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা সেখানে [চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে] বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারব না। তাই চীন যদি একটি এসএমআর স্থাপন করে, তাহলে তা দুই দেশের জন্যই উপকারী হবে।”

মংলার এই স্থানটি এর আগেও পরিবর্তিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মংলা বন্দরের কাছে ১১০ একর জমিতে ভারতীয় ঋণসুবিধার আওতায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতীয় কোম্পানিকে নির্ধারিত দুই বছরের মধ্যে ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ করতে না পারায় চুক্তিটি বাতিল করে।

এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় ঢাকা ও বেইজিং নতুন একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর আওতায় একই ১১০ একর জমিতে চীন-বাংলাদেশ মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২৫ জুন, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

তবে মংলার এসএমআর প্রস্তাবটি চীনের আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প-সংক্রান্ত অর্থায়ন প্রস্তাব থেকে আলাদা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এর আগে জানিয়েছিলেন, কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেও তারা কোনো আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়নি। তিনি বলেন, একটি চীনা কোম্পানি আর্থিক প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে সরকার সেটিকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলে বিবেচনা করেছে। সেই প্রস্তাবের সঙ্গে মংলার সম্ভাব্য এসএমআর প্রকল্পের কোনো সম্পর্ক নেই।
//ডিবিটেক/টিএনই/এসএমপি/এমভিএনও//