রাস্তাঘাট-আবাসন সংকট, মুখ থুবড়ে পড়ছে সুন্দরবনের অপার সম্ভাবনা
সাতক্ষীরা: এক পাশে সড়কপথ, অন্য পাশে গভীর সুন্দরবন। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে নদী, আর সীমান্তের ওপারে ভারত। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় অবস্থান সাতক্ষীরাকে দিয়েছে অনন্য পর্যটন সম্ভাবনা। দেশের একমাত্র জেলা হিসেবে এখান থেকে সড়কপথে সুন্দরবনের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সঙ্গে আছে ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, কপোতাক্ষ নদ, আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র, কলাগাছিয়া ও কচিখালী, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত এবং রূপসী […] The post রাস্তাঘাট-আবাসন সংকট, মুখ থুবড়ে পড়ছে সুন্দরবনের অপার সম্ভাবনা first appeared on Saraba

সাতক্ষীরা: এক পাশে সড়কপথ, অন্য পাশে গভীর সুন্দরবন। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে নদী, আর সীমান্তের ওপারে ভারত। প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় অবস্থান সাতক্ষীরাকে দিয়েছে অনন্য পর্যটন সম্ভাবনা। দেশের একমাত্র জেলা হিসেবে এখান থেকে সড়কপথে সুন্দরবনের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সঙ্গে আছে ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, কপোতাক্ষ নদ, আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র, কলাগাছিয়া ও কচিখালী, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত এবং রূপসী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।
কিন্তু সম্ভাবনার বিপরীতে বাস্তবতা অনেকটাই হতাশার। ভাঙাচোরা সড়ক, পর্যাপ্ত আবাসন ও রেস্টুরেন্টের অভাব, পর্যটকদের রাত্রিযাপনের জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিতে সাতক্ষীরার পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। বিশেষ করে শ্যামনগর হয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের বড় সম্ভাবনা থাকলেও সড়ক যোগাযোগের দুরবস্থা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সাতক্ষীরায় এলে যা যা দেখা যাবে—
সড়কপথে সুন্দরবনের হাতছানি
সাতক্ষীরার অন্যতম বিশেষত্ব হলো সড়কপথে সুন্দরবনের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ। তাই স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হয়েছে- ‘সাতক্ষীরার আকর্ষণ সড়কপথে সুন্দরবন।’
শ্যামনগরের পথে এগোলেই একদিকে লোকালয়, অন্যদিকে সুন্দরবন। নদীপথে পাড়ি দিয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় বনসংলগ্ন বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে। ভাগ্য সহায় হলে দেখা মিলতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার কিংবা হরিণের।
তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন অবকাঠামো। বাস্তবে সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক
কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের একদিকে লোকালয়, অন্যদিকে সুন্দরবন। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে খোলপেটুয়া নদী। লোকালয় পেরিয়ে নদীপথে সুন্দরবনের পশ্চিম অংশের ভেতর দিয়ে যেতে হয় কলাগাছিয়ায়। যাত্রাপথে দুই পাশে সারি সারি সবুজ বন পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
ঘাটে ট্রলার ভিড়তেই দেখা মেলে অসংখ্য বানরের। মূল অংশে প্রবেশের পথে রয়েছে লোহার সেতু। সেটি পেরোলেই রেস্টহাউস ও কাঠের আরেকটি সেতু। কাঠের সেতুর দুই পাশে খলিশা, হরকোচা ও বাইনগাছের সারি। বনের ভেতরে রয়েছে বানর ও হরিণের বিচরণ।
ওয়াকওয়ে ধরে এগিয়ে পাঁচতলা ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা যায় সুন্দরবনের বিস্তৃত সবুজ। বনের ভেতরের শিবমন্দিরে বনবিবির পূজাও করেন স্থানীয়রা ও দর্শনার্থীদের কেউ কেউ। অনেকের বিশ্বাস, সেখানে দর্শন করে বনে প্রবেশ করলে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
মান্দারবাড়ীয়া সমুদ্র সৈকত
হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর এক পাশে সুন্দরবন, অন্য পাশে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত। নির্জন এই সৈকত প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য হতে পারে অনন্য আকর্ষণ। প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতটি এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে অনেকটাই অচেনা।
সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর নৌঘাট থেকে মান্দারবাড়িয়ার দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা থেকে নীলডুমুর পর্যন্ত সড়কপথে যাওয়ার পর বাকি পথ পাড়ি দিতে হয় ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা স্পিডবোটে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোই এ দীর্ঘ যাত্রার প্রধান পথ।
নীলডুমুর ঘাট থেকে খোলপেটুয়া-কপোতাক্ষ নদের মোহনা পেরিয়ে কলাগাছিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া ও মালঞ্চ নদী ধরে যেতে হয় মান্দারবাড়িয়ায়। পুরো পথজুড়ে দুই পাশে সুন্দরবনের সবুজ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ এবং পানকৌড়ি, বালিহাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। নির্জন সৈকতের বালুচরে হরিণ কিংবা বাঘের পায়ের ছাপও ভ্রমণের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
প্রতাপাদিত্যের রাজধানীর স্মৃতি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে রয়েছে কয়েক শ বছরের ইতিহাস। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ঈশ্বরীপুরকে রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, শাহী মসজিদ, হাফসিখানা, হাম্মামখানা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার নিদর্শন।
একই এলাকায় এতগুলো ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকায় ঈশ্বরীপুরকে একটি ‘হেরিটেজ সার্কিট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দর্শনার্থীদের জন্য এসব স্থাপনার ইতিহাস জানার সুযোগ সীমিত। কোথাও নেই পর্যাপ্ত তথ্যফলক, কোথাও আবার সংরক্ষণ ও সংস্কারের ঘাটতি। ফলে এসব স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক পর্যটকের কাছেই অজানা থেকে যাচ্ছে।
শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পাশাপাশি যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, ঈশ্বরীপুরের হাম্মামখানা, বংশীপুর শাহী মসজিদ ও নকিপুর জমিদারবাড়ির মতো স্থাপনাগুলো শ্যামনগরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
তিনি বলেন, এসব স্থাপনা সংরক্ষণ ও সংস্কারের পাশাপাশি উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং দেশ-বিদেশে সমন্বিত প্রচার প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগে সুন্দরবনের সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘শ্যামনগর হেরিটেজ-ট্যুরিজম সার্কিট’ গড়ে তোলা যেতে পারে।
তৌহিদুর রহমানের ভাষায়, ‘সুন্দরবন আমাদের বিশ্বপরিচয়, আর ঐতিহ্য আমাদের শেকড়ের পরিচয়। দুটিকে সমন্বিতভাবে তুলে ধরতে পারলে শ্যামনগরের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে।’
নেই রাস্তাঘাট ও ভালো হোটেল-মোটেল
সাতক্ষীরার সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের আরেকটি বড় সমস্যা আবাসনব্যবস্থা। ভালো মানের হোটেল-মোটেল, কটেজ ও রেস্টুরেন্টের ঘাটতি রয়েছে। সুন্দরবনে রাত্রিযাপনের অনুমতিপ্রক্রিয়াও পর্যটকদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনা তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিলাল হোসেন বলেন, ‘সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ সড়কের বেহাল দশা, সুন্দরবনে প্রবেশের ফি বৃদ্ধি এবং রাত্রিকালীন অবস্থানের পাস না পাওয়ার কারণে পর্যটক দিন দিন কমছে। এতে পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকায়ও প্রভাব পড়ছে।’
তবে বন বিভাগ বলছে, অনলাইনে সুন্দরবনে প্রবেশের ফি পরিশোধ করে রসিদ জমা দিলে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকেই রাত্রিকালীন অবস্থানের পাস দেওয়া সম্ভব।
শ্যামনগরের বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ সুন্দরবনের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। পর্যটন খাত থেকেই অনেকে আয় করেন। কিন্তু রাস্তাঘাট সংস্কারের অভাব, ট্যুরিস্ট ট্রলারের ভাড়া বৃদ্ধি ও নানা কারণে পর্যটক কমে গেছে।’
তিনি বলেন, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে প্রথমেই সাতক্ষীরা থেকে মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত সড়কটি সংস্কার করা জরুরি। সুন্দরবনে দুই-তিন দিন বা রাত্রিকালীন অবস্থানের প্রয়োজন হলে পাসসংক্রান্ত জটিলতাও দূর করতে হবে। রাত্রিকালীন পাসের জন্য খুলনায় যেতে হওয়ায় পর্যটকদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি
মানবাধিকারকর্মী মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের একমাত্র জেলা সাতক্ষীরা, যেখান থেকে সড়কপথে সুন্দরবন উপভোগ করা সম্ভব। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে মুন্সিগঞ্জের প্রধান সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও জরাজীর্ণ।’
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় আসতে বর্তমানে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে। অথচ সাতক্ষীরা থেকে মুন্সিগঞ্জ যেতে সময় লাগে আরও প্রায় চার ঘণ্টা। সড়কের অবস্থার পাশাপাশি এ পথে পর্যাপ্ত ও উপযোগী পরিবহনব্যবস্থাও নেই।
মাধবচন্দ্র দত্তের মতে, দ্রুত সড়কটি সংস্কার করে চার লেনে উন্নীত করা এবং সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে সরাসরি পর্যটকবাহী বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা গেলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে।
যা বলছে প্রশাসন
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, ‘সুন্দরবনের পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, নদী ও জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, তথ্য সহজলভ্য করা এবং স্থানীয় নারী ও তরুণদের পর্যটন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
The post রাস্তাঘাট-আবাসন সংকট, মুখ থুবড়ে পড়ছে সুন্দরবনের অপার সম্ভাবনা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





