‘কী দোষ যে আমার ছাওয়ালটারে বাদ দিলেন?’
নীলফামারী: অভাবের সংসারে বড়ো হয়েছেন সোহেল রানা। তবে সত্যিকার অর্থে বড়ো হতে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমে ছিলেন অটুট। সেই শক্তিতেই তিনি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ইতিহাস বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তবে বিবিএসে প্রথম স্থান অর্জন করেও প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে বাদ পড়েন তিনি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নিয়োগ গেজেটে সেটি দেখা যায়। জনপ্রশাসন […] The post ‘কী দোষ যে আমার ছাওয়ালটারে বাদ দিলেন?’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

নীলফামারী: অভাবের সংসারে বড়ো হয়েছেন সোহেল রানা। তবে সত্যিকার অর্থে বড়ো হতে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমে ছিলেন অটুট। সেই শক্তিতেই তিনি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ইতিহাস বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। তবে বিবিএসে প্রথম স্থান অর্জন করেও প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে বাদ পড়েন তিনি।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নিয়োগ গেজেটে সেটি দেখা যায়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে, গত বছরের (১১ নভেম্বর) রাতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে ৬৮৩টি পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সেই তালিকায় ইতিহাস বিভাগে প্রথম হন সোহেল রানা।
সোহেল রানা নীলফামারী সদর উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের কুখাপাড়া গ্রামের কৃষক আবু হোসেনের ছেলে। সোহেল ২০১৪ সালে সোনারায় সংগলশী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫, এবং ২০১৬ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ- ৪.৯২ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০২০ সালে স্নাতক (সিজিপিএ ৩.৫৪) এবং ২০২১ সালে সিজিপিএ ৩.৫৬ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সোহেল রানার মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘অভাবের সংসারে কত কষ্ট করে পড়াশোনা করাইছি। আল্লাহ জানে কেন এমন হইলো আমার ছাওয়ালটার সাথে। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার পড়ে একটা চাকরিত বলে টেকিছে এখন শুনেছি আমার ছাওয়ালটারে নাকি বাদ দিয়েছে। কেন বারে আমার বাবাটার কী দোষ যে আমার ছাওয়াটারে বাদ দিলেন?’ এভাবেই চোখের পানি ঝড়াতে ঝড়াতে কথা গুলো বলছিলেন ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে বাদ পড়া সোহেল রানার মা।
সোহেলর বাবা আবু হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছি। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও শুধু এই আশায় তাকে পড়াশোনা করিয়েছি একদিন সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ভালো একটা চাকরি করবে। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে জমি-জায়গা বিক্রি করেছি। অনেক কষ্ট করে তাকে এতদূর নিয়ে এসেছি।’
যেদিন জানতে পারলাম, ‘আমার ছেলে বিসিএসে টিকে গেছে, সেদিন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। মনে হয়েছিল, এত বছরের কষ্ট অবশেষে সার্থক হয়েছে। কিন্তু গতকালের খবর শুনে আমরা একেবারে ভেঙে পড়েছি। যে ছেলে এত কষ্ট, পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে বিসিএসে উত্তীর্ণ হলো, শেষ পর্যন্ত গেজেটে তার নাম নেই- এটা একজন বাবা হিসেবে মেনে নেওয়া আমার জন্য খুবই কষ্টের। আমি সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, আমার ছেলের বিষয়টি যেন মানবিকভাবে বিবেচনা করা হয়। এত বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্ন যেন এভাবে শেষ হয়ে না যায়। আমার একটাই দাবি আমার ছেলের চাকরিটা যেন হয়। আজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে সরকারের কাছে শুধু এইটুকুই চাই।’
এ বিষয়ে সোহেল রানা বলেন, ‘৪৯তম বিসিএসে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। দীর্ঘ ১০ মাস পর গতকাল আমাদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেখানে আমার নাম না দেখে আমি নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছি। কী কারণে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটিও আমি জানি না। সাধারণত পুলিশ ভেরিফিকেশনে একজন ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি যদি কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো কাজ করেন বা সরকারবিরোধী কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে বিষয়টি সেখানে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এসব বিষয়ের সঙ্গে আমার পরিবার কিংবা আমি ন্যূনতম কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই। কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো, সেটি আমি নিজেও এখনো জানি না।’
চাকরিতে আবেদনের বয়স আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল বলেন, ‘চাকরিতে আবেদনের বয়স আছে। কিন্তু ৪৯তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর আর কোথাও সেভাবে আবেদনও করিনি বা চেষ্টা করিনি। কারণ আমার সর্বোচ্চ একটি চাওয়া ছিল সেই চাওয়াটি পূরণ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে আর কোথাও চেষ্টা করা হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিসিএসে সর্বোচ্চ মেধার প্রয়োগ করে টিকতে হয়। অন্য সব পরীক্ষার্থীর মতো আমাকেও অনেক দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। অনেক রাত নির্ঘুম কেটেছে। যখন আমি ৪৯তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করি, তখন আমি একটি চাকরি করতাম। সেই চাকরির পাশাপাশি ৪৯তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল।’
সোহেল রানা বলেন, ‘যদি প্রকাশ না হয়, তাহলে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বা পরিবারের সবার সামনে এই মুখ নিয়ে দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই। কোনোভাবেই তাদের সামনে যেতে পারছি না। গতকালের ফলাফলের পর সবাই হতভম্ব হয়ে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মাজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে ফলাফল শুনে জানতে পারলাম, ছেলেটি প্রথম হয়েছে এবং নাকি একটি ভেরিফিকেশন বাকি আছে। তখন আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তার বাবার কষ্ট করে পড়ানোটা সার্থক হবে। এবার পরিবারটি একটু শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু গতকাল শুনলাম, তাকে নাকি রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার দেখা মতে, সে কোনো দিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তাহলে তারা কীভাবে এত ভালো ফল করা, প্রথম হওয়া একটি ছেলেকে বাদ দেয়।’
সোনারায়-সংগলশী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিভূতি ভূষণ রায় বলেন, ‘সোহেল রানা ২০১৪ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করে। এরপর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ৪৯তম বিসিএসে সে ভালো ফলাফল করে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর তার নাম বাদ দেওয়ায় আমরা স্কুলের সব শিক্ষক ও এলাকাবাসী ব্যথিত।’
The post ‘কী দোষ যে আমার ছাওয়ালটারে বাদ দিলেন?’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





