ওটিটির খেলা!

ওটিটির খেলা!
২৬ জুন, ২০২৬ ০০:১২  

আইটি, টেলিকম এবং মিডিয়া ইন্ড্রাস্ট্রি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে ওটিটি(OTT) একটি অতি পরিচিত শব্দ। এছাড়াও পত্র-পত্রিকায় ওটিটি শব্দটি আপনাদের অনেকের চোখে পড়ে থাকতে পারে। বর্তমানে আমরা দৈনন্দিন জীবনে কোন না কোন ধরনের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চলেছি। 

OTT  শব্দটির পূর্ণ অর্থ Over The Top। ২০০০ সালের শুরুর দিকে আমেরিকার টেলিকম খাতে ওটিটি শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। প্রচলিত কেবল  টিভি, স্যাটেলাইট ডিস টিভি এবং টেলিকম নেটওয়ার্ককে বাইপাস করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রদত্ত ভয়েস, ভিডিওসহ অন্যান্য কন্টেন্ট সার্ভিসগুলোকে ওটিটি সেবা বলা হয়। 

মোবাইল, ফিক্সড টেলিকম, স‍্যাটেলাইট অপারেটর অথবা আইএসপি অপারেটররা যখন গ্রাহকদেরকে ইন্টারনেট সেবা দেয়। সেই ইন্টারনেটের উপর দিয়েই গ্রাহককে ওটিটি সার্ভিস প্রোভাইডাররা বিভিন্ন সার্ভিস দিয়ে থাকে। ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ওটিটি -র ব্যবহারও বাড়তে থাকে। 

টেলিকম অপারেটররা সর্বপ্রথম এই ধরনের সেবা প্রদানকারীদের ওটিটি নাম দেয়। আরও স্পস্ট করে বোঝার জন্য বলা যেতে পারে, টেলিকম অপারেটররা ওটিটিকে পরগাছার সাথে তুলনা করেছে। যাদের নিজস্ব কোন নেটওয়ার্ক নেই টেলিকম অপারেটরের নেটওয়ার্কের উপর নির্ভর করে সেবা দেয়। 

অল্প কিছুদিন আগে স্কাইপ বন্ধ হলেও, স্কাইপের মত ভয়েস কলিং এ‍্যাপ দিয়েই বহুল পরিচিত ওটিটির ব‍্যবহার শুরু হয়। তখন ইন্টারনেটের উপর দিয়ে পিসি-টু-পিসি, পিসি-টু-ফোন, এ‍্যাপ-টু-এ‍্যাপ, এ‍্যাপ-টু-ফোনসহ নানা উপায়ে কল করা শুরু হয়।প্রচলিত টেলিকম নেটওয়ার্ককে বাইপাস করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই সেবা প্রদান করা শুরু হয়। পরবর্তীতে স্কাইপের মত শত শত ডেস্কটপ এবং স্মার্টফোন মোবাইল কলিং ও মেসেজিং এ‍্যাপ বাজারে আসে। 

বর্তমানে হোয়াটসএপ, ফেসটাইম, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো, বটিম, উইচ‍্যাট,সিগন্যাল, টেলিগ্রাম ইত্যাদি পরিচিত অনেক কলিং ও মেসেজিং এ‍্যাপ গ্লোবাল মার্কেটে বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ব্রিলিয়ান্ট কানেক্ট, আলাপ, আম্বার আইটি, ডায়াল, অগ্নিটক ইত‍্যাদি বাংলাদেশের স্থানীয় কলিং ও মেসেজিং এ‍্যাপ বা ওটিটি যা দিয়ে এ‍্যাপ-টু-এ‍্যাপ ও এ‍্যাপ-টু-ফোন কল করা যায়। ওটিটির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রচলিত নাম্বার টু নাম্বার ডায়াল কলিং ও এসএমএস আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে।

ফেসবুক, টিকটক, ইন্সটাগ্রাম জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ওটিটি প্লাটফর্ম। কনসোল গেমিং বাদ দিয়ে এ‍্যাপভিত্তিক ওটিটি গেমিং এখন বেশী জনপ্রিয়। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, এ‍্যাপল টিভি, হুলু, আমাজন প্রাইম ইত্যাদি গ্লোবাল ভিডিও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। অন‍্যান‍্য দেশের মত বাংলাদেশেও স্থানীয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আছে, যেমন- হইচই, চরকি, বায়োস্কোপ, বঙ্গো, টফি, বিন্জ, র‍্যাবিটহোল ইত্যাদি। এইসব সেবাকে VOD বা ভিডিও অন ডিমান্ডও বলা হয়ে থাকে। তবে কোন কোন প্ল্যাটফর্ম লাইভ টিভি ব্রডকাস্ট করে থাকে। ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলোর ক্ষেত্রে ওটিটি শব্দটি ব‍্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। 

শুরুর দিকে টেলিকম অপারেটররা ওটিটিকে তেমন কোন পাত্তাই  দিতো না। সেই কারনে ওটিটিদেরকে এক রকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেই ওটিটি বা পরগাছা নাম দিয়েছিল। কিন্তু ওটিটিরা ক্রমেই প্রচলিত অপারেটরদের রাজস্বে বড় ধরনের ভাগ বসানো শুরু করে। তখন টেলিকম বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের সাথে ওটিটিদের ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়। 

ব্রডব্যান্ড অপারেটররা ওটিটিদের রাজস্বে ভাগ বসাতে চায়। ওটিটিদের ফ্রি রাইড বন্ধ করতে চায়। তারা ওটিটিদের ব্লক করে, স্লো লেন ও ফাস্ট লেন সার্ভিস অফার দেয়া শুরু করে। অর্থাৎ যে ওটিটি ব্রডব্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডারের সাথে রাজস্ব শেয়ার করবে তার কন্টেন্ট গ্রাহক ভালো কোয়ালিটি দেখতে পারবে আর যে রাজস্ব শেয়ার করবে না তার কোয়ালিটি (থ্রটল) খারাপ হবে। 

সেই প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে আমেরিকার কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির আইনের প্রফেসর টিম উ (Tim Wu) “Network Neutrality” ধারণাটি প্রবর্তন করেন, যা পরবর্তীতে নেট নিউট্রালিটি বিতর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই ডিবেট বা যুক্তিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ইন্টারনেটর সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে কোন ওটিটি বা কন্টেন্ট প্রোভাইডারদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না।আইনিভাবে অনুমোদিত সকল ওটিটিদেরকে  ব্রডব্যান্ড প্রোভাইডাররা সমানভাবে বিবেচনা করবে। 

আমেরিকা-ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পুরোপুরি নেট নিউট্রালিটি নীতি গ্রহণ করেছে। তবে কিছু কিছু দেশ সম্পূর্ণ নেট নিউট্রালিটি না করে কিছু কিছু ব‍্যতিক্রম করেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এমএনও ও ওটিটির মধ্যে নেট নিউট্রালিটি বিতর্ক হয়েছে যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা মধ্যস্থতা করে নেট নিউট্রাল করে দিয়েছে। 

২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন বাংলাদেশের বিভিন্ন ওটিটি প্লাটফর্মের পারফর্মেন্স নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক শোরগোল হলো। লাইভ খেলা দেখানো নিয়ে বাংলাদেশের আইএসপিরা আপস্ট্রীম ব‍্যান্ডউইথ নিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের খেলার দিনগুলোতে ব‍্যান্ডউইথ সমস্যা প্রকট।বর্তমানে টিভি মানেই এনরয়েড স্মার্ট টিভি এবং বাসাবাড়িতে স্মার্ট মোবাইলসহ স্মার্ট ডিভাইসের অভাব নাই। লাইভ খেলা, নিউজ, নাটক, সিনেমা দেখাসহ আরও অন্যান্য অনেক সেবা এখন গ্রাহকরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওটিটি দিয়ে পেতে চায়।

খুলনার একজন কেবল টিভি(ডিস) ব্যবসায়ী জানালো তার আড়াই হাজার ডিস সংযোগ কমে এখন মাত্র  দুইশত হয়েছে। কিন্তু কিছু দিন আগে শুরু করা তার আইএসপিতে এখন প্রায় দুই হাজার গ্রাহক।আমার ধারণা সারা বাংলাদেশের চিত্র একই রকম।

বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা নেট নিউট্রালিটি ডিবেট নিয়ে কি ভাবছেন তা কখনও জানার সুযোগ হয় নি। তবে ওটিটি রেগুলেশন নিয়ে মাঝে মাঝে তথ‍্য মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির মধ্যে যে টানাপোড়েন চলে তা শোনা যায়। কিছু কিছু  আইএসপি বিটিআরসি থেকে আইপিটিভির অনুমোদন নিয়ে লাইভ টিভি চ‍্যানেল দেখানো শুরু করেছিল, শুনলাম তথ‍্য মন্ত্রণালয়ের চাপে সেটাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গায়ের জোরে কোন টেকনোলজিকে বন্ধ করে রাখা যায় না। 

কনভারজেন্স মেনে নিয়ে সবাই মিলে নীতিকাঠামো তৈরী করে যে কোন নতুন টেকনোলজিকে গ্রহন করাটা জরুরী।জনগণকে সেই টেকনোলজির সুবিধা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।


লেখকঃ সিইও, ইন্টারক্লাউড লিমিটেড


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।