অণুর ‘ডান-বাম’ রহস্যের সমাধান

রসায়নে নোবেল কাগান ও সোআইয়ের

  • অরৈখিক প্রভাব ও স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের স্বীকৃতি
  • কাইরাল অণুর একক রূপ তৈরির পথ দেখিয়েছেন তাঁরা
  • ওষুধসহ বহু শিল্পে গবেষণার ব্যবহার বাড়ছে

রসায়নে নোবেল কাগান ও সোআইয়ের
৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:২৪  

অণুর আয়না-প্রতিবিম্ব রূপের রহস্য এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট রূপকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রক্রিয়া উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি বি. কাগান ও জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোআই। অরৈখিক প্রভাব ও অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে স্ব-অনুঘটনের আবিষ্কারের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সময় ৭ অক্টোবর, বুধবার বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সংবাদ সম্মেলনে এ বছরের রসায়নে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। একাডেমির ঘোষণায় বলা হয়েছে, কাগান ও সোআইয়ের আবিষ্কার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের পুরোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করেছে। উত্তর মিলেছে, প্রকৃতিতে জীবনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কেন একটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ অন্যটির তুলনায় প্রাধান্য পায়।

রসায়নে অনেক অণু দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে, যেগুলো পরস্পরের আয়না-প্রতিবিম্ব। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় কাইরালিটি, আর এমন দুটি অণুকে বলা হয় এনান্টিওমার। তাদের পরমাণু ও রাসায়নিক বন্ধনের বিন্যাস একই হলেও ত্রিমাত্রিক গঠনে তারা একে অপরের আয়না-প্রতিবিম্ব।

জীবন্ত প্রাণীর ক্ষেত্রে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই রাসায়নিক সূত্র ও প্রায় একই গঠন থাকা সত্ত্বেও একটি এনান্টিওমার কাঙ্ক্ষিত জৈবিক কাজ করতে পারে, অন্যটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ওষুধ তৈরিতে নির্দিষ্ট কাঙ্ক্ষিত রূপটি বেছে নিয়ে উৎপাদন করা গুরুত্বপূর্ণ।

এই সমস্যার সমাধানের পথে বড় অগ্রগতি আসে অঁরি কাগানের গবেষণায়। ১৯৮৬ সালে তিনি দেখান, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় খুব সামান্য পার্থক্যকে অনেক বড় মাত্রায় বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। অনুঘটকের কাইরাল রূপগুলোর সামান্য অনুপাতগত পার্থক্যও উৎপাদিত অণুর মধ্যে অনেক বড় অসমতা তৈরি করতে পারে। এই ঘটনাই অরৈখিক প্রভাব হিসেবে পরিচিত।

এরপর কেনসো সোআই এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেন, যেখানে বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া কাইরাল অণুই পরবর্তী বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ব-অনুঘটনমূলক বিক্রিয়া তৈরি করেন, যা একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপের প্রাধান্য তৈরির সম্ভাবনা দেখায়।

২০০৩ সালে সোআই আরও বড় অগ্রগতি অর্জন করেন। তিনি এমন একটি বিক্রিয়া দেখান, যেখানে শুরুতে কোনো কাইরাল অণু না থাকলেও সামান্য দৈব পার্থক্য থেকে একটি রূপের আধিক্য তৈরি হয় এবং সেই রূপই পরবর্তী বিক্রিয়ায় নিজের উৎপাদনকে আরও ত্বরান্বিত করে। শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরো উৎপাদন একই আয়না-প্রতিবিম্ব রূপের অণুতে পরিণত হতে পারে।

এই প্রক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে রসায়নবিদেরা একটি দীর্ঘদিনের মৌলিক প্রশ্নের কাছাকাছি পৌঁছেছেন—জীবনের রাসায়নিক অণুগুলো কীভাবে একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপকে প্রাধান্য দেওয়া অবস্থায় গড়ে উঠল। পৃথিবীর আদিম রাসায়নিক পরিবেশে এমন কোনো স্ব-প্রবর্ধনশীল প্রক্রিয়া কাজ করেছিল কি না, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

তবে কাগান ও সোআইয়ের গবেষণা দেখিয়েছে, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় খুব ছোট একটি অসমতা সময়ের সঙ্গে নিজেকে বহুগুণ বাড়িয়ে নিতে পারে। এই নীতির গুরুত্ব শুধু মৌলিক রসায়নে নয়; নির্দিষ্ট কাইরাল অণু তৈরির প্রয়োজন হয় এমন ওষুধ ও অন্যান্য রাসায়নিক পণ্য তৈরিতেও এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অঁরি বি. কাগানের জন্ম ১৯৩০ সালে ফ্রান্সের বুলোঞ্জ-বিয়ঁকুরে। তিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদ-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক। কেনসো সোআইয়ের জন্ম ১৯৫০ সালে জাপানের হিরোশিমায়। তিনি টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক।

২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। দুই বিজয়ীর মধ্যে এই অর্থ সমানভাবে ভাগ হবে।

এর আগে ৬ অক্টোবর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

//ডিবিটেক/পিএএন/এসএমপি/ডিপিও//