‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর গোলটেবিলে আইনপ্রণেতা, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভ; অস্পষ্ট ধারায় নিপীড়নের শঙ্কা
সাইবার আইনের সংশোধনে ডিএসএ-র ছায়া: বাক্স্বাধীনতা হরণ ও বিচারহীনতার আশঙ্কায় নাগরিক সমাজ
- প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে গুজব, অপতথ্য ও মানহানির মতো অস্পষ্ট অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রেখে ভিন্নমত দমনের সুযোগ তৈরির তীব্র প্রতিবাদ
গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার মতো অস্পষ্ট অভিযোগে মামলা ও কঠোর শাস্তির সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এর সংশোধনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) ভুক্তভোগীরা । বক্তারা অভিযোগ করেছেন, নাগরিক সুরক্ষার কথা বলা হলেও মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানো এবং ভিন্নমত দমনে এটি কুখ্যাত ডিএসএ ও আইসিটি আইনেরই নতুন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে ।
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনের অষ্টম তলায় সংস্কারবিষয়ক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত “আবারও হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা: সংশোধিত সাইবার আইন কতটুকু DSA-র প্রতিচ্ছবি?” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব অভিমত তুলে ধরা হয় ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সর্বমহলের দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে । নির্বাচিত সরকার আসার পর চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদ অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত রেখে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ হিসেবে পাস করে । কিন্তু সম্প্রতি আইনটিতে নতুন কিছু বিতর্কিত ধারা যুক্ত করার উদ্যোগ নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের মধ্যে তীব্র ভীতি ও সংশয় তৈরি করেছে ।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস । তিনি সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, নারী-শিশু সুরক্ষা এবং বাকস্বাধীনতা যেন শালীনতার সীমা না ছাড়ায়—সরকার এই দুটি যুক্তি দিচ্ছে । অথচ যৌন হয়রানি, সেক্সটর্শন, রিভেঞ্জ পর্ন ও শিশু নিপীড়ন বিদ্যমান আইনেই দণ্ডনীয় অপরাধ; খসড়ায় নতুন কোনো যৌন অপরাধ যোগ হয়নি । বরং যোগ করা হয়েছে মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, গুজব ও অপতথ্যের মতো ধোঁয়াশাপূর্ণ অপরাধ ।
শালীনতার যুক্তি খণ্ডন করে ড. নাবিলা ইদ্রিস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "প্রশ্নটা শালীনতা নিয়ে নয়, শাস্তি কে দেবে তা নিয়ে। বাকস্বাধীনতা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকের অধিকার, আর শালীনতা পরস্পরের প্রতি আমাদের দায়। বেয়াদবির জন্য পুলিশ এলে সেটা আর পারিবারিক বিষয় থাকে না, থানার বিষয় হয়ে যায়। রাষ্ট্র অভিভাবক নয়, নাগরিকও শিশু নয়। আইন দিয়ে শালীনতা আদায় করতে গেলে শালীনতা ফেরে না, বাকশাল ফেরে ।" তিনি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, সংশোধনী পাস হওয়ার আগেই অনলাইন পোস্টের জেরে দেশে প্রায় ২১টি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে শিক্ষার্থী, গৃহিণী, সাধারণ গ্রামবাসী এবং ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোরও রয়েছে । এসব ঘটনায় পুলিশের আগে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা সক্রিয় হয়েছেন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ৫৪ ধারা ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করা হয়েছে । তাঁর মতে, "আইন দেখে গ্রেপ্তার হচ্ছে না, গ্রেপ্তার দেখে আইন হচ্ছে ।"
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন আইনের খসড়ার মারাত্মক অসংগতি তুলে ধরে বলেন, বিদ্যমান ২৫ নম্বর ধারাটি ছিল যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও অশ্লীলতা রোধের রক্ষাকবচ । কিন্তু সংশোধনীতে সেখানে কৌশলে ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ শব্দ দুটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে । সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, ‘হেয়প্রতিপন্ন’-এর সংজ্ঞায় কারও মর্যাদা বা অবস্থান ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো আচরণ, কথা এমনকি ‘ইঙ্গিত’-কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার মানবাধিকারের নামই শুনতে চায় না । জুলাই সনদের মূল চেতনা ছিল ‘সীমিত সরকার’, কিন্তু এটি উল্টো পথে হাঁটছে । সরকারের উদ্দেশে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আপনারা বলছেন পাঁচ বছর পর হারলে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তাহলে এমন কোনো আইন করবেন না, যার ফল ভবিষ্যতে আপনাদেরই ভোগ করতে হয় ।"
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, "বিভিন্ন নামে পুরোনো কালো আইন ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। র্যাবের নাম বদলালেও যেমন চরিত্র বদলায়নি, তেমনি আইনের ক্ষেত্রেও একই রূপ দেখা যাচ্ছে ।" গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তভার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে না উল্লেখ করে তিনি নাগরিকদের মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রতিবাদ জানান ।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ বলেন, সাইবার আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের সাইবার নিরাপত্তা । কোন ক্ষেত্রে আইন প্রয়োজন আর কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই, তা আগে সরকারকে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে ।
অল্টারনেটিভের সংগঠক ডা. তাজনুভা জাবীন শাস্তির মাত্রাগত বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সহিংসতার মতো সংবেদনশীল অপরাধে যেখানে দুই বছরের সাজা রাখা হয়েছে, সেখানে গুজব ও অপতথ্যের মতো অনির্ধারিত অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত সাজার প্রস্তাব চরম বৈষম্যমূলক এবং এটি মতপ্রকাশকে রুদ্ধ করবে ।
দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জায়মা ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনটি গুজব আর কোনটি মানহানি—তা নির্ধারণ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে দেওয়ায় ঢাকার বাইরের স্থানীয় সাংবাদিকরা চরম বিপদে পড়বেন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করতে ভয় পাবেন ।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া খসড়ার ‘দায়মুক্তি’র বিধানকে প্রধান উদ্বেগের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, কেবল শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে অপরাধ কমানো যায় না; আইনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু প্রয়োগই জরুরি । সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, বাক্স্বাধীনতা হরণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই; গুজব প্রতিরোধের নামে মফস্বলের নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে । তিনি জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলন জারি রাখার আহ্বান জানান। ভয়েস ফর রিফর্মের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন মন্তব্য করেন, সংশোধনীগুলো নাগরিক সুরক্ষার চেয়ে রাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব ও দমন ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছে ।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন ডেইলি ওয়াদারের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হুসাইন, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, সপ্রাণের রিসার্চ ডিরেক্টর জারিফ রহমান এবং ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্কের গোলাম মাহফুজ।
//ডিবিটেক/ আইএইচ/ এমএসআই/ বিপিও//
গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার মতো অস্পষ্ট অভিযোগে মামলা ও কঠোর শাস্তির সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’-এর সংশোধনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) ভুক্তভোগীরা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনের অষ্টম তলায় সংস্কারবিষয়ক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত “আবারও হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা: সংশোধিত সাইবার আইন কতটুকু DSA-র প্রতিচ্ছবি?” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব অভিমত তুলে ধরা হয়
অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্যে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সর্বমহলের দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস
শালীনতার যুক্তি খণ্ডন করে ড. নাবিলা ইদ্রিস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "প্রশ্নটা শালীনতা নিয়ে নয়, শাস্তি কে দেবে তা নিয়ে। বাকস্বাধীনতা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকের অধিকার, আর শালীনতা পরস্পরের প্রতি আমাদের দায়। বেয়াদবির জন্য পুলিশ এলে সেটা আর পারিবারিক বিষয় থাকে না, থানার বিষয় হয়ে যায়। রাষ্ট্র অভিভাবক নয়, নাগরিকও শিশু নয়। আইন দিয়ে শালীনতা আদায় করতে গেলে শালীনতা ফেরে না, বাকশাল ফেরে
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন আইনের খসড়ার মারাত্মক অসংগতি তুলে ধরে বলেন, বিদ্যমান ২৫ নম্বর ধারাটি ছিল যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও অশ্লীলতা রোধের রক্ষাকবচ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, "বিভিন্ন নামে পুরোনো কালো আইন ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। র্যাবের নাম বদলালেও যেমন চরিত্র বদলায়নি, তেমনি আইনের ক্ষেত্রেও একই রূপ দেখা যাচ্ছে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ বলেন, সাইবার আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের সাইবার নিরাপত্তা
অল্টারনেটিভের সংগঠক ডা. তাজনুভা জাবীন শাস্তির মাত্রাগত বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সহিংসতার মতো সংবেদনশীল অপরাধে যেখানে দুই বছরের সাজা রাখা হয়েছে, সেখানে গুজব ও অপতথ্যের মতো অনির্ধারিত অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত সাজার প্রস্তাব চরম বৈষম্যমূলক এবং এটি মতপ্রকাশকে রুদ্ধ করবে
দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জায়মা ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনটি গুজব আর কোনটি মানহানি—তা নির্ধারণ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে দেওয়ায় ঢাকার বাইরের স্থানীয় সাংবাদিকরা চরম বিপদে পড়বেন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করতে ভয় পাবেন
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া খসড়ার ‘দায়মুক্তি’র বিধানকে প্রধান উদ্বেগের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, কেবল শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে অপরাধ কমানো যায় না; আইনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু প্রয়োগই জরুরি
গোলটেবিল বৈঠকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন ডেইলি ওয়াদারের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হুসাইন, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, সপ্রাণের রিসার্চ ডিরেক্টর জারিফ রহমান এবং ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্কের গোলাম মাহফুজ।
//ডিবিটেক/ আইএইচ/ এমএসআই/ বিপিও//





