যা হলো বিটিআরসির সপ্তম গণশুনানি-তে

• দেশীয় এআই প্ল্যাটফর্ম কনভে ও জুমে হাইব্রিড গণশুনানি অনুষ্ঠিত
• ন্যাশনাল ফাইবার গ্রিড ও ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানোর আশ্বাস
• ডাটা প্যাকেজ বিভ্রান্তি রোধে সক্ষমতা প্ল্যাটফর্ম তৈরির তথ্য প্রকাশ

যা হলো বিটিআরসির সপ্তম গণশুনানি-তে
১৯ আগষ্ট, ২০২৬ ১২:১৮  
১৯ আগষ্ট, ২০২৬ ১৪:২০  

ডিজিটাল সংযোগের মানোন্নয়ন, গ্রাহক অধিকার সুরক্ষা এবং টেলিকম অবকাঠামো শক্তিশালী করতে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সপ্তম গণশুনানি। ১৯ আগস্ট, বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজিত এই শুনানিতে গ্রাহকদের অভিযোগ ও মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার জানানো হয়। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অনলাইন পর্বটি দ্বিতীয়বারের মতো পরিচালিত হয় দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল মিটিং প্ল্যাটফর্ম ‘কনভে’-এর মাধ্যমে; পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীরা এতে জুম লিংকেও যুক্ত ছিলেন।

শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন।

গত ১৭ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত শুনানির জন্য ২ হাজার ৯৯০ জন নিবন্ধন করেন (যার মধ্যে ১৭২ জন নারী, ১০৪৭ জন পেশাজীবী এবং ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী)। প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ সম্পর্কিত ১০৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স সম্পর্কিত ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম সম্পর্কিত ৬৩টি, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং সম্পর্কিত ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন সম্পর্কিত ৫টি। শুনানিতে উঠে আসে কলরেট, ট্যারিফ, ডাটার মেয়াদ, ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর, লাইসেন্স ও সেবার মানসংক্রান্ত নানা প্রশ্ন।

স্বাগত বক্তব্যে স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ধারা ৮৭ অনুযায়ী কমিশন প্রতি চার মাসে অন্তত একবার গণশুনানি আয়োজন করবে। তিনি জানান, উত্থাপিত প্রতিটি গঠনমূলক প্রশ্ন ও সুপারিশ কমিশনের ‘গণশুনানি কার্যপর্যবেক্ষণ তালিকা’-তে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন জানান, ২০২৫ সালের শুনানিতে আসা ১,৭৫৬টি অভিযোগের মধ্যে কমিশন সংশ্লিষ্ট ২২১টি (সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস ১২০, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স ৬০, স্পেকট্রাম ৩৯ এবং এনফোর্সমেন্ট ২টি) চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অপর এক তথ্যে জানানো হয়, হেল্পলাইন ও ওয়েব মিলিয়ে জমা পড়া ১৩ হাজার অভিযোগের মধ্যে ১১২৭৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যার হার ৮৬.৭ শতাংশ। তবে এই হারে কমিশন পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। ২০২৬ সালে সরাসরি ১১টি প্রশ্নসহ মোট ২,২৯০টি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, যেখানে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১২ শতাংশ এবং ১,২৩৪টিরও বেশি ছিল মোবাইল সেবা সম্পর্কিত।

গ্রাহক পর্যায়ে কানেক্টিভিটি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও ন্যাশনাল ফাইবার গ্রিড চালুর বিষয়ে আইএসপি ব্যবসায়ী সালাউদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি জানায়, সারাদেশে শক্তিশালী ব্যাকবোন তৈরিতে গত ৩-৪ মাস ধরে নিবিড় কাজ চলছে। সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস মহাপরিচালক জানান, সকল অপারেটরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা নতুন ন্যাশনাল ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক গাইডলাইন পাস হলে একটি ফাইবার ক্যাবল ব্যবহার করে বহুবিধ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

জামালপুরের রাকীব রায়হানের কলরেট কমানোর প্রশ্নে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২ টাকা হলেও গ্রাহকস্বার্থে ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলমান রয়েছে। টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ বলেন, টেলিটক রোলআউট বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে এবং হাওর-বাঁওড়সহ দুর্গম অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।

গাজীপুরের তৌহিদ হাসানের এসএমএস মাস্কিং ও ইন্টারন্যাশনাল ওটিপি প্রাপ্তির জটিলতা এবং মোঃ মারুফের প্রমোশনাল বার্তার ক্রাইটেরিয়া সংক্রান্ত প্রশ্নে বিটিআরসি জানায়, অ্যাপ্লিকেশন-টু-পারসন (A2P) মেসেজ মাস্কিং হয়, বাকিগুলোর ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি দূর করতে সকল এসএমএসকে মাস্কিংয়ের আওতায় আনার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক ওটিপি জটিলতার সঙ্গে আর্থিক ও কারিগরি দিক জড়িত।

বিদ্যুৎ চলে গেলে কলড্রপ ও ডাটা প্যাকেজে বিভ্রান্তি নিয়ে আনোয়ার সাদাতের প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, প্যাকেজের সুবিধার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ স্পষ্ট রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ জানান, সেবা নজরদারিতে আনতে এরই মধ্যে ‘সক্ষমতা প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হয়েছে।

ফুয়াদ হাসান খানের ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড ও ৫জি গতি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS) আপডেটের তথ্য দিয়ে জানানো হয়, ড্রাইভটেস্টে কোনো অপারেটরের মান নিচে পাওয়া যায়নি এবং আগামী মাস থেকে প্রতিমাসে QoS প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। বিটিআরসি আরও স্পষ্ট করে, ইন্টারনেট রেডিয়েশনের প্রভাব সংক্রান্ত দাবি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। দেশে বর্তমানে ৫৬ হাজার টাওয়ার থাকলেও চাহিদা মেটাতে ৭০ হাজারের বেশি টাওয়ার প্রয়োজন। অপারেটরদের প্যাকেজের মূল্যের পার্থক্যের বিষয়ে জানানো হয়, অপারেটরদের ব্যয়ের তারতম্যের ওপর ভিত্তি করে এবং বাজার প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সিলিং ও ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়া হয়।

বিটিআরসি ভবন থেকে পরিচালিত এই শুনানিতেবিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মেহেদি উল সহিদ, স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আমিনুল হক এবং লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক আশীষ কুমার কুন্ডুসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। //ডিবিটেক/আইএইচ/এমআইএস//