নির্বাচনে এআই-এর অপব্যবহার 

নির্বাচনে এআই-এর অপব্যবহার 
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০০:৩১  
৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৮:০৭  

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা এনে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন নতুন হুমকিও ।

নির্বাচন যেহেতু সন্নিকটে, তাই সম্প্রতি এর কিছু অপব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে ততই এই মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। বিগত দিনের নির্বাচনেও এআই এর অপব্যবহার হয়েছিল। কিন্তু সেটার ব্যবহার ছিল খুব কম। এখন যেহেতু মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন এবং এআই ভিত্তিক চ্যাটবট যে কেউ ব্যবহার করতে পারে; তাই এর অপব্যবহার নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে।

নির্বাচন আসলেই  তৈরি করা হয় নতুন নতুন গুজব। নতুন নতুন বট একাউন্টের আবির্ভাব হয়। ফলে ভুলতথ্য ও অপতথ্যের ছড়াছড়ি এখন সোশাল মিডিয়াগুলোতে।  এর সাথে যুক্ত হয়েছে এআই ভিত্তিক ডিফফেইক ভিডিও, অডিও ও ছবির ব্যবহার। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে দেয়া একটা প্রযুক্তির নাম হলো ডিফফেইক। এর কারসাজিতে হুবুহু অন্যের মুখাবয়ব ব্যবহার করে খুব বাস্তবসম্মত ভিডিও ও ছবি তৈরি করা সম্ভব- যা আসল মানুষের মতোই দেখায়। সাধারনত রাজনৈতিক, সামাজিক, বা ব্যক্তিগত কাজে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ডিফফেইকের বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে পর্নোগ্রাফিতে, যা সেলিব্রেটিদেরকে টার্গেট করে করা হয়। নির্বাচনে প্রার্থীর মুখাবয়ব বা কণ্ঠ ব্যবহার করে ভুয়া বক্তব্য বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া, কোনো প্রার্থীর নামে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেয়ার শঙ্কা রয়েছে। এগুলো ভোটের আগে ছড়িয়ে দিলে এতে মানুষ বেশি বিভ্রান্ত হবে। ফলে নির্বাচনের আগের ২৪–৪৮ ঘণ্টা সবচেয়ে বিপজ্জনক।

এআই দিয়ে হাজার হাজার ভুয়া নিউজ, পোস্ট, ব্লগ বানানো যাচ্ছে সহজে ও দ্রততার সঙ্গে। নির্বাচনের পূর্বে ভোট বাতিল, নির্বাচন স্থগিত বা অমুক প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে এমন গুজব ছড়াতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হবে। ইতিমধ্যে সোশাল মিডিয়াগুলোতে বিভিন্ন বট একাউন্ট ও ভুয়া পেইজের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। এইসব বট একাউন্ট দিয়ে প্রতিপক্ষকে খারাপ ভাবে উপস্থাপন, বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এক পক্ষকে ভালোভাবে উপস্থাপন ও অন্য পক্ষকে খারাপভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এর মাত্রাটা আরো বৃদ্ধি পাবে এছাড়া এআই দিয়ে হাজার হাজার ভুয়া রিভিউ বা কমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে যা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সব জায়গায় জনমতকে প্রভাবিত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। কে বেশি জনপ্রিয় এবং কোন দল কত ক্ষমতায় আসবে, কত পার্সেন্ট ভোট পাবে তা ভুয়া বট একাউন্ট দিয়ে তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। 

সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের করণীয়ঃ 
এআই হতে পারে নির্বাচনের সহায়ক প্রযুক্তি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি হয়ে উঠবে গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। এআই এর অপব্যবহার রোধে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উল্লেখিত পদক্ষেপ গুলো অনুসরণ করতে পারে। 

নির্বাচনের সময় সন্দেহজনক,ভুয়া,ফেইক কনটেন্ট দ্রুত নামানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যেমন, ফেইসবুক, এক্স, ইনস্ট্রাগ্রাম  ও ইউটিউবের মতো প্লাটফর্মগুলোর সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি করা আবশ্যক। 

নির্বাচন কমিশনের অধীনে ডিপফেইক শনাক্ত করার টুল ও বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যেমে একটা সেন্ট্রাল ইউনিট গঠন করা দরতার; যারা ২৪/৭ দেশের সাইবা আকাশ পর্যবেক্ষণ করবে। 

ভুয়া এআই ভিত্তিক কনটেন্ট ছড়ালে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে এআই ব্যবহার সংক্রান্ত স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে। 

গুজব শনাক্ত করতে দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং সিস্টেম থাকা এবং অনলাইন ভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। 

ভোটারদের সচেতনতা তৈরি করতে ডিপফেইক ভিডিও কিভাবে চিনবেন সেই বিষয়ক ক্যাম্পেইন তৈরি করা এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার করা। 

নির্বাচন কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য "কোড অব কন্ডাক্ট" থাকা এবং এআই অপব্যবহার না করার লিখিত অঙ্গীকার করা। 

এআই এর অপব্যবহার রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে, নির্বাচনের আগে ও পরে যে কোন সময়ে যে কোনো ধরনের অনাকাংখিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই, এআই এর সঠিক ব্যবহার জানুন, সচেতন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।  


লেখকঃ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সাইবার ক্যানিয়ন; "AI প্রযুক্তির হাতে খড়ি" বইয়ের লেখক। 


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।