বৈধতা দিতে চায় বাজারে স্থিত সব হ্যান্ডসেট
এনইআইআর বাস্তবায়নে হ্যান্ডসেট আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছে বিটিআরসি
বাংলাদেশে অবৈধভাবে আমদানি ও বিক্রিত মোবাইল ফোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে চালু হতে যাওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পাশাপাশি মোবাইল ফোন আমদানি এবং উৎপাদন পর্যায়ে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সমন্বিত এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে অবৈধ মোবাইল বাণিজ্য রোধ, রাজস্ব সংরক্ষণ এবং নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বাজারে স্থিত সব হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের আওতায় এনে বৈধতা দেয়ার পথে হাঁটছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
সূত্রমতে, বর্তমানে দেশের স্মার্টফোন উৎপাদনের হার প্রায় ৬৩ শতাংশ। বাকি অংশ আমদানি নির্ভর। তবে আমদানিকৃত ফোনের ওপর আরোপিত ভ্যাট ও শুল্ক বেশি হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত ফোনের ওপর কর কাঠামো যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করার লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে বিটিআরসি। চিঠিতে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ (PCB/PCBA)-এর ওপর কর ছাড়ের ব্যবস্থাও বিবেচনায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের আমদানি শুল্ক ৫৮.৬ শতাংশকে নামানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। ফলে তারা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় থেকেও ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে আছেন। অন্যদিকে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল হ্যান্ডসেট বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যার কারণে সরকার বছরে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এনইআইআর চালু হলে শুধুমাত্র বৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা মোবাইল ফোনই নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যাবে, অবৈধ ফোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
এনইআইআর মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেইস সিস্টেম, যেখানে দেশের বৈধ সব মোবাইল ফোনের আইএমইআই (আইএমআই) নম্বর নিবন্ধিত থাকবে। যে কোনো ফোন নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার আগে তার আইএমইআই এই ডাটাবেইজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এতে অবৈধভাবে আমদানি, ক্লোন বা নকল মোবাইল ফোন শনাক্ত হয়ে যাবে এবং তা নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে পারবে না। বিটিআরসি জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল চুরি, প্রতারণা ও অর্থনৈতিক জালিয়াতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
বিটিআরসি আরও জানিয়েছে, এনইআইআর চালুর আগে দেশের বাজারে থাকা অনুমোদনহীন হ্যান্ডসেটগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এসব ফোনের আইএমইআই নম্বর বিটিআরসির ডাটাবেইজে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা যেতে পারে, যাতে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ ক্ষতির মুখে না পড়েন।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিআরসি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) মধ্যে একাধিক পত্রব্যবহারের পর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এনইআইআর চালুর অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারীর কার্যালয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও তুরস্কে এনইআইআর বা অনুরূপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব দেশে এই ব্যবস্থা চালুর পর অবৈধ ফোনের ব্যবহার ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে, সরকারের রাজস্ব বেড়েছে এবং স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও একই ফলাফল প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিটিআরসি মনে করে, এনইআইআর চালু হলে দেশের বৈধ মোবাইল উৎপাদন ও বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়াও টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ব্যবহারকারীরা নিরাপদ নেটওয়ার্ক সেবা পাবেন। বিটিআরসির মহাপরিচালক মোঃ আমিনুল হক এসইউপি স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, অবৈধ ফোন রোধ, রাজস্ব সুরক্ষা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে এনইআইআর কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য গত ৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি ডাক ও টেলিযোগাযেগা বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
ডিবিটেক/জেএইচ/ইহক



