নতুন টেলিকম নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের দাবি

নতুন টেলিকম নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের দাবি
১৬ মে, ২০২৬ ১১:৪৫  
১৬ মে, ২০২৬ ১১:৪৯  

দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আগামী এক দশকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে নতুন টেলিকম নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম, সরকারি অবকাঠামো উন্মুক্ত করা, একক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আধুনিক নীতিকাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত ডিজিটাল সেবা ভোগকারী বাজারে পরিণত হলেও উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উৎপাদন ও উচ্চমূল্যের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য এখনই সমন্বিত নীতি সংস্কার জরুরি।

শনিবার রাজধানীর ইন্টার কন্টিনেন্টাল ঢাকায় টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত পলিসি সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।


১৬ মে, শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে টিআরএনবি আয়োজিত পলিসি সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও রবি আজিয়াটার কোম্পানি সচিব ব্যারিস্টার শাহেদ আলম। 

টেলিকমের ভবিষ্যত ও নতুন সরকারের ভাবনা বিষয়ক মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, টেলিকমের নতুন যুগে প্লাটফর্ম ও সংযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গত দশকে ডেটার ব্যবহার ৮০ শতাংশ বেরেছে। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ মোবাইলের, ইন্টারনেট ৫৫ এবং ডিজিটাল ওয়ালেট ৫০ শতাংশ বেড়েছে। মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের যোগাযোগ বেড়েছ। অবকাঠামো প্রস্তুত। তরঙ্গের ব্যবহার বেড়েছে ৪ গুণ।

টিআরএনবি সভাপতি স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। রবিন বলেন, গত দুই যুগে বিদেশি বিনিয়োগ না আসা ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে ধারাবাহিক আয়োজনের অংশ হিসেবে এই সেমিনার পলিসি গ্রহণে সহায়তা করবে।

 অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রী ফকির মাহবুব  আনাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে আছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আসিফ আসাদ রেহান ও  বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী। 

বক্তা হিসেবে উপস্থিত আছেন ফিকা সিইও নূরুল কবির, প্রতিযোগিতা কমিশনের আবেগ পরিচালক আবু নাসের,  মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যমটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার, টেলিটক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরি, বাংলালিংক হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান ও বুয়েট অধ্যাপক ড. লুৎফা আক্তার। 

মূল প্রবন্ধে শাহেদ আলম জানান,  গত এক দশকে দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ডিজিটাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। দেশে ইউনিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার এখনো অর্ধেকের নিচে এবং স্মার্টফোন ব্যবহারও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিক দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী সাবমেরিন ক্যাবল, ফাইবার নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার ও ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই বলে উল্লেখ করা হয়।

উপস্থাপনায় বলা হয়, আগামী দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি এবং আইওটি ব্যবহারের কারণে দেশে ডেটার চাহিদা কয়েকগুণ বাড়বে। সেই বাস্তবতায় এখন থেকেই নতুন জাতীয় টেলিকম নীতি, নতুন ব্রডব্যান্ড নীতি এবং সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। 

তিনি মনে করেন, বর্তমান নীতিকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির চাহিদা মোকাবিলা সম্ভব হবে না।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, টেলিকম খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো, জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজ করা, কর কাঠামো আধুনিকায়ন এবং স্পেকট্রামের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অবকাঠামো টেলিকম অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করা, ফাইবার স্থাপনে একক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু এবং অবকাঠামো শেয়ারিং বাধ্যতামূলক করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল ডেটার দাম তুলনামূলকভাবে কম হলেও ব্যবহার বিশ্ব গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এর অন্যতম কারণ হলো মানসম্মত ব্রডব্যান্ড সেবার সীমাবদ্ধতা এবং ডিভাইসের উচ্চমূল্য। ফলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন, গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনটেন্ট ও মোবাইলভিত্তিক সেবাকেন্দ্রিক। কিন্তু ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড সেবা, উন্নত সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা, স্টার্টআপ বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

তিনি মনে করেন, সঠিক নীতি সহায়তা ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ শুধু ডিজিটাল ভোক্তা বাজার নয়, বরং আঞ্চলিক ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
ডিবিটেক/আইএইচ/ইকে