প্রযুক্তি গ্রহণে উৎপাদন ব্যয় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা
‘ন্যানোটেকনোলজি ছাড়া টেকসই টেক্সটাইল শিল্প গড়া কঠিন’
বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পকে টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে ন্যানোটেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
তিনি বলেছেন, টেক্সটাইল ওয়েট প্রসেসিং খাতে অতিরিক্ত পানি ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ও পানিসম্পদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় ন্যানোটেকনোলজি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে এ প্রযুক্তি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, এজন্য শিল্পখাতকে সরকারি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
১৬ মে, শনিবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল টেক্সটাইল ওয়েট প্রসেসিং থ্রু ন্যানোটেকনোলজি: ইন্ডাস্ট্রিয়াল অপরচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইইবির টেক্সটাইলকৌশল বিভাগ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে টেক্সটাইল খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা দেশের জন্য গর্বের বিষয়। তবে এই শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত পানি ব্যবহার, বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হচ্ছে। ন্যানোটেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পানি ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমবে এবং উৎপাদন আরও পরিবেশবান্ধব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রকৌশলীদের শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণাভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির টেক্সটাইলকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, টেক্সটাইল শিল্পে অতিরিক্ত পানি ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পানি পুনর্ব্যবহার এবং গ্রীন এনার্জির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব।
অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব)-এর আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, উন্নত দেশগুলো টেক্সটাইল খাতের আয়ের বড় অংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করায় তারা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশেও আধুনিক টেক্সটাইল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আইইবির প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, টেক্সটাইল খাতকে গবেষণাভিত্তিক শিল্পে রূপান্তর করতে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র এবং জাতীয় পর্যায়ে আধুনিক টেক্সটাইল গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা জরুরি।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের (বুটেক্স) উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, টেক্সটাইল শিল্পের রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন ছাড়া পরিবেশে ফেলা হলে তা নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ইটিপি নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগেই দেশে ১৯৭৮ সালে টেক্সটাইল বিষয়ে স্নাতক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।
স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, দেশের টেক্সটাইল খাত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সুতা, কাপড়, কেমিক্যাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির কারণে সেই আয়ের বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিকল্প নেই।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুটেক্সের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী ইমানা শাহরিন তানিয়া। তিনি বলেন, ওয়েট প্রসেসিং খাতে অতিরিক্ত পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে ন্যানোটেকনোলজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইইবির টেক্সটাইলকৌশল বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী মো. মুস্তফা-ই-জামান। শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান।
ডিবিটেক/এসআই/এমইউএম



