বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার

বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার
১৭ মে, ২০২৬ ২০:৩২  

দেশের বিদ্যুৎ খাত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকির চাপে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত নীতিমালা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি।

১৭ মে, রবিবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সৃষ্ট অর্থনৈতিক বোঝা: সংকট ব্যবস্থাপনায় নীতিগত সুপারিশ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে সেমিনারটির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও মিয়ানমার ইকোনমিক জোন অথরিটির (মিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক চাপে কার্যত ‘মাইনাস অবস্থানে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতার কারণে সরকারকে বড় ধরনের বাধ্যবাধকতা বহন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। উৎপাদন না হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও পর্যাপ্ত সূর্যালোকের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং অর্থনৈতিক চাপও হ্রাস পাবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির সভাপতি ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অপচয়ের কারণে দেশের গ্যাস খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিকল্পনার অভাব ও অবিবেচনাপ্রসূত ব্যবহারের কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্বাগত বক্তব্যে আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, অতীতে বিদ্যুৎ খাতে অনেক প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে অনেক প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার প্রয়োজন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী এম. রেজওয়ান খান। তিনি বলেন, গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও খাতটি এখন গভীর আর্থিক সংকটে রয়েছে।

তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বেশি হওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী সরকারকে এসব কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে, যা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জন্য বড় আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে।

অধ্যাপক রেজওয়ান খান আরও বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাত ক্রমেই এলএনজি, কয়লা ও তেলের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আলী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী মুহাম্মাদ কামরুল হাসান খান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন।

এ সময় আইইবির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, কাউন্সিল সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের প্রতিনিধি, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।

ডিবিটেক/এসআই/এমইউএম