স্মার্ট বন্দর গড়ার উদ্যোগ
অটোমেশনে বদলাবে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা
- ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
- নির্মিত হবে দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি
- লক্ষ্য বছরে প্রায় চার লাখ টিইইউ হ্যান্ডলিং
দুটি আধুনিক কনটেইনার জেটি, স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতি, পৃথক কার্গো ইয়ার্ড এবং আধুনিক স্ক্যানিং সুবিধা যুক্ত করে স্মার্ট বন্দর গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় চার লাখ টিইইউতে উন্নীত হবে। একই সঙ্গে পণ্য ওঠানো-নামানো, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়বে।
৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটি এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে তিনি মোংলা বন্দরে পৌঁছান। পরে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (CCECC) প্রস্তুত একটি উপস্থাপনা প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ফারুক ও কমিটির সদস্যরা। আরও উপস্থিত ছিলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, নৌপরিবহন সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
চীনা প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিলেন চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (CRCC) চেয়ারম্যান দাই হেগেন, বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাউন্সেলর সং ইয়াং এবং CCECC-এর চেয়ারম্যান লি চংইয়াং। আমদানি-রপ্তানি ও বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
দুটি জেটি ও আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল
‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ (Expansion and Modernization of Mongla Port Facilities) প্রকল্পের আওতায় ১০ ও ১১ নম্বর জেটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের নির্মাণকাল চার বছর। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩৬৮ মিটার দীর্ঘ ও ৪০ মিটার প্রশস্ত জেটি নির্মাণ করা হবে। এতে একসঙ্গে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন (DWT) ধারণক্ষমতার দুটি জাহাজ অথবা ৫০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি জাহাজ ভেড়ানো যাবে।
প্রকল্পের মোট আয়তন ২ লাখ ২৭ হাজার বর্গমিটার। এর মধ্যে ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার এলাকায় বোঝাই কনটেইনার ইয়ার্ড, ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার এলাকায় খালি কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার এলাকায় বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার রাখার ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া ৫০ হাজার ৪০০ বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ সড়ক, ২ হাজার ৫১৭ বর্গমিটার প্রশাসনিক ভবন এবং ৩ হাজার ৯০৯ বর্গমিটার কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (CFS) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অটোমেশন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি
বন্দর পরিচালনায় গতি ও দক্ষতা বাড়াতে প্রকল্পে আধুনিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হবে। প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে চারটি শোর-টু-শিপ ক্রেন, সাতটি রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (RTG), ১০টি টার্মিনাল ট্রাক্টর, ১০টি টার্মিনাল ট্রেলার, দুটি এম্পটি কনটেইনার হ্যান্ডলার, একটি রিচ স্ট্যাকার, একটি কনটেইনার ওজনযন্ত্র এবং একটি স্থায়ী কনটেইনার স্ক্যানার।
শোর-টু-শিপ ক্রেন জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহৃত হবে। RTG ক্রেন ইয়ার্ডে কনটেইনার স্থানান্তর ও স্তূপ করে রাখবে। টার্মিনাল ট্রাক্টর ও ট্রেলার কনটেইনার পরিবহনে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, কনটেইনার স্ক্যানার এবং ওজনযন্ত্র নিরাপত্তা ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন সুবিধা চালু হলে ঘণ্টায় ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে। বার্ষিক সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় চার লাখ টিইইউতে। এতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিরাপদে কনটেইনার সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সম্ভাবনা
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের ফলে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, পাটজাত পণ্য, তাজা খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের আমদানি-রপ্তানিকারকের জন্য পৃথক কনটেইনার ব্যবস্থাপনা সুবিধা তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA), বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন এবং শিপিং এজেন্টদের মতো প্রতিষ্ঠানের বন্দর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়বে।
ইতোমধ্যে মোংলা বন্দরের সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌপথের বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। নতুন জেটি ও কনটেইনার ইয়ার্ড চালু হলে এসব যোগাযোগপথ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরকে বাংলাদেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অটোমেটেড কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক স্ক্যানিং, দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং উন্নত ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দর পরিচালনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য লজিস্টিকস সুবিধা উন্নত হতে পারে।
চীনা অর্থায়ন ও প্রকল্পের অগ্রগতি
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চলেছে। ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান CCECC-এর সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন করে। একই বছরের ২৫ মার্চ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও CCECC-এর মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০২৬ সালের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (CIDCA) এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) মধ্যে প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মধ্যে ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঋণটির সুদের হার ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর; এর মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ও চীনা ঋণের অঙ্ক এক নয়। চীনা ঋণের পাশাপাশি প্রকল্পে বাংলাদেশের অর্থায়নও রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঋণচুক্তির অর্থ দিয়ে দুটি আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করা হবে।
মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন, আমদানি-রপ্তানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও লজিস্টিকস সংযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তবে বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নির্ভর করবে জেটি ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের পাশাপাশি নৌপথের নাব্যতা, পণ্য পরিবহনের সংযোগ এবং দক্ষ পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পস্থলের কাছে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে প্রকল্প বাস্তবায়ন, দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নতি কামনায় দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
//ডিবিটেক/কেএবিপিআর/এসএমপি/এমভিএনও//





