রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জরুরি ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

ঢাকা: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও […] The post রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জরুরি ৫ প্রস্তাব প্রধান

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জরুরি ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:০০  

ঢাকা: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন; রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ; পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত; ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং মাদকপাচার, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে আরও একটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে।’

মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে তাদের শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে। রোহিঙ্গা তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতি থাকে।’

তবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বিপুল আকার ধারণ করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করছে। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।’

মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য।’

তিনি বলেন, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না।’ বাংলাদেশের পাশে অব্যাহতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তাদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন।’ তবে মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের ওপর বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক।’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য ধরনের নিরাপত্তাহীনতাসহ গুরুতর লঙ্ঘন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি।’

প্রথম প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। এতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা তৈরি হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যেতে পারে—বাংলাদেশের প্রত্যাশা সেটিই।’

প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে। বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে। এই গল্পের সূচনা এখনই হওয়া প্রয়োজন।’

The post রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জরুরি ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.