জনতা ব্যাংকে জালিয়াতি-আত্মসাৎ-পাচারের ঝুঁকি তৈরি
ঢাকা: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে (সিবিএস) দীর্ঘদিনের অদাবিকৃত আমানত শনাক্তের ব্যবস্থা নেই। ফলে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে লেনদেনহীন হিসাবের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের […] The post জনতা ব্যাংকে জালিয়াতি-আত্মসাৎ-পাচারের ঝুঁকি তৈরি first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sp

ঢাকা: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে (সিবিএস) দীর্ঘদিনের অদাবিকৃত আমানত শনাক্তের ব্যবস্থা নেই। ফলে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে লেনদেনহীন হিসাবের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শুধু দেশীয় কার্যক্রম নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও জনতা ব্যাংকের কার্যক্রমে বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। সেখানে ৪১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন দিরহামের শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কার্যালয়ে অনুমোদন ছাড়া তিন ভারতীয় কর্মকর্তা নিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে। আবার ২১ হাজার ৮৯২ দিরহামে কেনা ছয়টি ল্যাপটপের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া, বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিং নিয়ম মানা হয়নি। বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে যথাসময়ে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করায় প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের নামে একই কারণে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ হারিয়েছে ব্যাংক। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে জনতা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার তদারকির ঘাটতি, অদক্ষতা ও অকার্যকারিতার কথা বলা হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে।
জনতা ব্যাংকের সিবিএস ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে লেনদেনহীন হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অদাবিকৃত থাকা আমানতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অদাবিকৃত আমানতের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। এ কারণে দীর্ঘদিন অজ্ঞাত থাকা অর্থ আত্মসাতের সুযোগ এবং গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ৫৮টি শাখার ৪৮৮টি হিসাবে ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ ছিল ৯৪ কোটি টাকা। তবে ওই তালিকায় স্থানীয় কার্যালয়সহ অনেক শাখার তথ্য ছিল না। ফলে ব্যাংকের প্রকৃত অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ জানা যায়নি। জনতা ভবন করপোরেট শাখার তিনটি সুন্ড্রি হিসাবে ৫৪ লাখ টাকা ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে লেনদেনহীন ও অদাবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
এর বাইরে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) হিসাবেও নিয়ম ভঙ্গের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইডিএফের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক জনতা ব্যাংকের এফসি ক্লিয়ারিং হিসাব ডেবিট করলেও কিংবা এলসি পরিশোধের জন্য শাখা নস্ট্রো হিসাব ডেবিট করলেও গ্রাহকের নামে যথাসময়ে দায় সৃষ্টি করা হয়নি।
এ ছাড়া, ইডিএফের অসমর্থিত এন্ট্রিগুলোও দীর্ঘদিন সমন্বয় করা হয়নি। গত ৩০ জুন স্থানীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো অ্যাডভাইসের মাধ্যমে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ২৭ হাজার ৬৫৩ ডলারের অসমর্থিত এন্ট্রির মধ্যে ৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬৪ হাজার ডলার সমন্বয় করা হয়েছে। একই বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ একাধিকবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও শাখা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিষয়টিকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা ও অকার্যকারিতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জনতা ভবন করপোরেট শাখার নস্ট্রো হিসাব থেকে অর্থ ডেবিট করার পর যথাসময়ে ফোর্সড বা ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের পাওনা দায় সৃষ্টি হয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদ আয়ও হিসাবভুক্ত হয়নি। বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে যথাসময়ে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করায় ব্যাংকটি প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ হারিয়েছে। অন্যদিকে ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের নামে একইভাবে ডিমান্ড লোন সৃষ্টি না করায় আরও প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ হারিয়েছে ব্যাংকটি। এ বিষয়ে মোট প্রায় ৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা সুদ আদায়ের সুযোগ থেকে ব্যাংক বঞ্চিত হয়েছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিংয়ের বকেয়া বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। গ্রাহকের হিসাবে সৃষ্ট নস্ট্রো ডেবিট দায় ৮ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা এখনো সমন্বয় করা যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রমেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমে ৪১ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন দিরহামের শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে। এ ছাড়া শেখ খলিফা ফান্ডের ফাইন্যান্স মার্জিন, মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজ ও শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের নামে থাকা দীর্ঘমেয়াদি ১৪২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন দিরহাম বা প্রায় ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ অবলোপনের বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ইউএইতে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কার্যালয়ে ১২ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাদের মধ্যে তিনজন ভারতীয় কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া, ২০২০ সালের ২৭ মে লিবার্টি কম্পিউটার্স এলএলসি থেকে ২১ হাজার ৮৯২ দিরহামে ছয়টি ল্যাপটপ কেনা হয়। কিন্তু পরিদর্শনের সময় এসব ল্যাপটপের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ইউএইতে ব্যাংকের বিভিন্ন খাতে অনুমোদিত ব্যয়ের সীমার চেয়ে প্রকৃত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি হয়েছে। আল-আইন শাখায় চলতি হিসাবের লেজার স্থিতির তুলনায় স্টেটমেন্ট অব অ্যাফেয়ার্সে ৬ হাজার ৭৭২ দিরহাম কম পাওয়া গেছে। শারজাহ শাখায় সুন্ড্রি ডিপোজিট ও সুন্ড্রি অ্যাসেট হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ দিরহামের পার্থক্যের কোনো ব্যাখ্যা নেই। দুবাই শাখায় লেটার অব গ্যারান্টির মার্জিন হিসাবে সুন্ড্রি ডিপোজিটের স্টেটমেন্ট ও লেজার ব্যালান্সের মধ্যে ৯ লাখ ১০ হাজার দিরহামের পার্থক্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকের প্রদর্শিত স্থিতির তুলনায় ট্রান্স গার্ড ব্যাংকে ১৮ কোটি ৭০ লাখ দিরহাম কম রয়েছে। সুন্ড্রি ক্লিয়ারিং হিসাবেও ৮৯ লাখ ৪৮ হাজার দিরহামের ঘাটতি রয়েছে।
ইতালির রোমে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ও রোম শাখা আগে একই জায়গায় ছিল। ২০১৭ সালে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দুটি পৃথক অফিস নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতালি থেকে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি এসআরএলের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যাংকের দিলকুশা করপোরেট শাখার ‘সুন্ড্রি অ্যাকাউন্ট—অ্যাডভান্স পেমেন্ট টু ট্রান্সফার’ খাত থেকে অগ্রিম পরিশোধ করা হয়েছে।
ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক্সচেঞ্জ কোম্পানিটির লোকসানের কারণে ২০১৫ সাল থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের বিপরীতে কভার ফান্ড থেকে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব অনিয়মের পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার তদারকি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘাটতিও চিহ্নিত হয়েছে। একই বিষয়ে বারবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান অদক্ষতা ও ত্রুটির বিষয় স্বীকার করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপের বিষয়টি সবার জানা। আমরা জবাব দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে আপত্তরি বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভালো করে জবাব দেওয়া হবে। আর হলমার্কের প্রায় ৮০ কোটি টাকার মত অদাবিকৃত অর্থ আদালতে মামলা থাকায় ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। আদালতের আদেশ পেলে তা সমন্বয় করা হবে। এ ছাড়া, নস্ট্রো হিসাবে যে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, তা সিস্টেমের ত্রুটির কারণে হয়েছে। এটা সামনে দূর করা হবে। যদিও এভাবে ব্যাংক চালাতে ঝুঁকি থাকে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতে মূলধন বাড়ানো হয়েছে। মাদার ব্যাংক হিসাবে ২ বিলিয়ন দিরহাম সমপরিমান অর্থ নিশ্চিতি করতে বলা হয়েছে। সেটা অর্থ মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। আমরা খেলাপি আদায়ে দিচ্ছি। এক্সিট পলিসির মাধ্যমে আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’
জনতা ব্যাংকের এসব অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় অনিয়মের বিপক্ষে। সেটা ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান পূর্ববর্তী হোক, কিংবা পরবর্তী হোক। আর বিদেশে অনিয়ম হলে তো পার পাবে না। আইন মেনে সব করা হবে। কোন অপরাধী যেন পার না পায়। অপরাধীর কোনো পরিচয় দেখে না বাংলাদেশ ব্যাংক।’
The post জনতা ব্যাংকে জালিয়াতি-আত্মসাৎ-পাচারের ঝুঁকি তৈরি first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





