দাম বাড়ার আগে পাম্পে ভিড়

লিটারে বাড়ল ২০ টাকা

  • রাতেই পাম্পে দীর্ঘ যানবাহনের সারি
  • সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর
  • আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ে চাপ

লিটারে বাড়ল ২০ টাকা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৪২  

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর প্রকাশের পর নতুন দর কার্যকর হওয়ার আগেই আগের দামে তেল নিতে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ভিড় করেছেন যানবাহনের চালক ও মালিকেরা। রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, যশোর, সিলেট, খুলনা, কক্সবাজার, মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। আবার সেই সারি থেকে অনেককেই ফেসবুক, টিকটকে লাইভে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। 

এদিন রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে ডিজেল ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।

দাম বাড়ার আগে তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে অনেকেই রাতেই পাম্পে ছুটে যান। এতে কয়েকটি এলাকায় রাতেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু পাম্পে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার সময়ের আগে বিক্রি সীমিত রাখা হয় এবং পরে নতুন দরে বিক্রি শুরু করা হয়।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুর মোড় এলাকার মেসার্স পার্ক ফিলিং স্টেশনে শতাধিক মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তবে পাম্পকর্মীরা চাহিদার তুলনায় অল্প পরিমাণে জ্বালানি দিচ্ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে কয়েকজনকে তেল না নিয়েই ফিরে যেতেও দেখা যায়।

কুষ্টিয়ার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। তেল নিতে আসা কয়েকজন চালক বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই বেশি। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

মাগুরা শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও চালক ও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করেন।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় রাতেই মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভিড় দেখা যায়। সেখানে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, এক লিটার তেলের দাম ২০ টাকা বাড়লে প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয়ও বাড়বে। তাই দাম বাড়ার আগে মোটরসাইকেলে তেল ভরে নিতে এসেছেন।

আরেক চালক বলেন, আয়ের তুলনায় ব্যয় এমনিতেই বেশি। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবার ও যাতায়াত—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিক বলেন, রাতেই পাম্পে মানুষের ভিড় দেখে বোঝা যাচ্ছে, দাম বাড়ার খবরে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার আশঙ্কা, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে।

এক ফিলিং স্টেশনকর্মী জানান, দাম বাড়ার খবর পাওয়ার পর রাত থেকেই মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতাদের চাপ বেশি ছিল।

কেন বাড়ল দাম

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি তেল বিক্রিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। The Financial Express জানিয়েছে, এই সময়ে বিপিসির ক্ষতি প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকিও বেড়েছিল বলে মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।

এর আগে ৩১ আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। তখন ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা নির্ধারিত ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে এক মাসের মধ্যেই চার ধরনের জ্বালানির দাম আবার সমন্বয় করা হলো।

অর্থনীতিতে প্রভাবের শঙ্কা

জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল দেশের পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র বলছে, দেশের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশ ডিজেল; এর সবচেয়ে বড় অংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন, যাত্রী পরিবহন, কৃষির সেচ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ে প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য অতিরিক্ত ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও একটি অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

নতুন দরে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারে জ্বালানি বিক্রি শুরু হওয়ায় এখন পরিবহন ব্যয়, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব কতটা পড়ে—সেদিকেই নজর থাকবে।
//ডিবিটেক/ডিপিওজিএস/এসএমই/বিপিও//