পানির উৎস বদল, বিলিং অটোমেশন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কড়া নির্দেশ

দুই মাসে অগ্রগতি না হলে ওয়াসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

  • দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
  • ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ৭৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০–২৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য
  • মিটার রিডিং ও বিলিং অটোমেশন এবং প্রকল্পের গতি বাড়ানোর নির্দেশ

দুই মাসে অগ্রগতি না হলে ওয়াসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৮  

ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পে আগামী দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ব্যর্থ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, উপরিভাগের পানিভিত্তিক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মিটার রিডিং ও বিলিংয়ে অটোমেশন জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য নয়। দুই মাস পর তিনি আবারও ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন এবং এর মধ্যে দৃশ্যমান ও মৌলিক পরিবর্তন দেখতে চান।

পানির উৎসে পরিবর্তনের তাগিদ

প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে দৈনিক পানির চাহিদা ও সরবরাহ—উভয়ই ৩১৪ কোটি লিটার। জনসংখ্যা ও বাসাবাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু গত সাত মাসে ওয়াসার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য নতুন উদ্ভাবন বা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি বলে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

বর্তমানে সরবরাহকৃত পানির ৭৪ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং ২৬ শতাংশ উপরিভাগের উৎস থেকে আসে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের অংশ ২০–২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সামনে রেখে উপরিভাগের পানিনির্ভর প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে এ লক্ষ্য অর্জনে কোন কোন প্রকল্প কত সময়ের মধ্যে শেষ হবে, সে বিষয়ে সভায় নির্দিষ্ট সময়সূচির কথা জানানো হয়নি।

দাসেরকান্দি প্রকল্প ও পূর্বাচল নেটওয়ার্ক

চলমান প্রকল্পের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় পাইপলাইন সংযোগ প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পূর্বাচল এলাকায় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের নির্দেশও দেন তিনি।

প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দীর্ঘসূত্রতা দূর করা জরুরি।

ওয়াসা বোর্ড বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত

ওয়াসার পরিচালনা কাঠামো নিয়েও বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান আইনে ওয়াসায় বোর্ড রাখার বিধান থাকলেও সরকার যেকোনো সময় তা গঠন বা ভেঙে দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে বোর্ডের কার্যক্রম জনসেবামূলক কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতিতে আইন সংশোধন করে বাংলাদেশের সব ওয়াসা থেকে বোর্ড তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া, সময়সীমা এবং প্রস্তাবিত বিকল্প পরিচালনা কাঠামো সম্পর্কে সভায় বিস্তারিত জানানো হয়নি।

বিলিং অটোমেশন ও আর্থিক সক্ষমতা

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেবার মান বজায় রেখেই ঢাকা ওয়াসাকে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এতে বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

এ লক্ষ্যে মিটার রিডিং ও বিলিংয়ে অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে ২০৫০ সালের পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটির আধুনিকায়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য জমা দিতে বলেন।

বিলিং অটোমেশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মিটার রিডিং ও বিল তৈরির প্রক্রিয়া আরও নিয়মতান্ত্রিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি, বাস্তবায়ন সময়সূচি বা অগ্রগতি পরিমাপের সূচক সভায় উল্লেখ করা হয়নি।

অবৈধ সংযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধের নির্দেশ

শহরের অবৈধ ও চোরাই পানির লাইন চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা ব্যাহত করা যাবে না বলে সিবিএ ও কর্মচারী সংগঠনগুলোকে সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি দাঁত ব্রাশ বা শেভ করার সময় অপ্রয়োজনে কল খোলা না রাখা এবং পানির অপচয় রোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশ দেন।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন, সিবিএ নেতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন।

//ডিবিটেক/এমবিইউ/এসএমপি/এমআইএসটি//